উত্তরাধিকার শিক্ষা ব্যবস্থা ও অর্ধেক বুদ্ধি

Date: 2026-05-22
news-banner

মোঃ তরিকুল ইসলাম মোস্তফা
একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু পাঠদান বা পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেটি জাতির চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক কাঠামো এখনও বহন করে চলেছে ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা ও নীতির ছাপ। এর অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হলো ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় মাত্র ৩৩ নম্বর পেয়ে পাস করার নিয়ম।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ এ পাস নম্বরের পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নতুন আলোচনা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উপমহাদেশে ৩৩ নম্বরে পাসের ধারণাটি ব্রিটিশ শাসকদের বৈষম্যমূলক চিন্তার ফল। তারা মনে করতেন, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ব্রিটিশদের তুলনায় অর্ধেক। সেই ধারণা থেকেই ইংল্যান্ডে যেখানে পাস নম্বর ছিল ৬৫, সেখানে উপমহাদেশে তা নির্ধারণ করা হয় ৩২ দশমিক ৫, যা পরে ৩৩-এ উন্নীত হয়।
যদি সত্যিই এমন মনোভাবের ভিত্তিতে এই পদ্ধতি চালু হয়ে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে একটি অপমানজনক ইতিহাস। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও বাংলাদেশ সেই পুরোনো কাঠামো থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল না জ্ঞানভিত্তিক, সৃজনশীল বা গবেষণামুখী জাতি তৈরি করা। বরং তারা এমন একটি শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যারা প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় সহায়ক হবে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন না করে, শুধু নির্দেশ পালন করতে শেখে। এর প্রভাব আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার নানা স্তরে দৃশ্যমান।
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা মানেই দক্ষতা, উদ্ভাবন, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি। অথচ বাংলাদেশে এখনও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন এবং সর্বনিম্ন নম্বর পেলেই উত্তীর্ণ হওয়ার সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের গভীরতা তৈরি হওয়ার পরিবর্তে কেবল পরীক্ষায় পাস করার প্রবণতা বাড়ছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে পার্থক্যটি স্পষ্ট বোঝা যায়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাস নম্বর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সেখানে শুধু নম্বর নয়, দক্ষতা ও বাস্তব প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার। শুধু পাস নম্বর বাড়ানোই সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন সামগ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার। শিক্ষার্থীরা কতটা বুঝছে, কতটা বিশ্লেষণ করতে পারছে এবং বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছে কি না, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের মূল মানদণ্ড।
তবে ইতিহাসের এই ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, “অর্ধেক বুদ্ধি” তত্ত্বের বিষয়টি আরও গবেষণার দাবি রাখে। কারণ ব্রিটিশ আমলের সব নথিতে এ ধরনের বক্তব্যের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবুও এটি সত্য যে, উপমহাদেশের শিক্ষা কাঠামো এখনও অনেকাংশে ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণার প্রভাব বহন করছে।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষানির্ভর নয়, জ্ঞাননির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। অন্যথায় আমরা হয়তো সনদ অর্জন করব, কিন্তু প্রকৃত অর্থে যোগ্য ও সৃজনশীল মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হব।


বিডিফেস/মেহেদী হাসান দ্বীপ

Leave Your Comments