বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৪): জলবায়ু ভূ-রাজনীতি: গ্রিন এনার্জি ও রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসের দখল লড়াই
অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ৪:৫৮ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ৪:৫৮ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৪): জলবায়ু ভূ-রাজনীতি: গ্রিন এনার্জি ও রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসের দখল লড়াই
অ-অ+
বিশেষ সিরি | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরো দৃশ্যপট নিয়ন্ত্রণ করেছে মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসল ফুয়েল। তেল ও গ্যাসের খনি কার দখলে থাকবে, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ মরুভূমির ওপর কার আধিপত্য বজায় থাকবে—তার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়েছে পরাশক্তিগুলোর সামরিক আগ্রাসন, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি। তবে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বরাজনীতির এই পুরোনো সমীকরণ দ্রুত বদলে যেতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য শক্তি বা গ্রিন এনার্জির দিকে ঝুঁকে পড়ার যে বৈশ্বিক রূপান্তর বা ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ শুরু হয়েছে, তা জন্ম দিয়েছে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার। পরিবেশ বাঁচানোর এই বৈশ্বিক প্রচেষ্টার অন্তরালে বর্তমানে চলছে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এক নির্মম ও নিঃশব্দ লড়াই।
জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সৌর প্যানেল, উইন্ড টারবাইন, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (EV) এবং উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তির বিস্তার অপরিহার্য। আর এই সবুজ প্রযুক্তির কাঁচামাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে একঝাঁক অত্যন্ত দুর্লভ খনিজ পদার্থ, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস’ (Rare Earth Elements) এবং ক্রিটিক্যাল মিনারেলস নামে পরিচিত। নিওডিমিয়াম, লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল এবং গ্রাফাইট বা তামার মতো এই খনিজগুলো ছাড়া আধুনিক গ্রিন টেকনোলজি অচল। সমস্যা হলো, এই দুর্লভ খনিজগুলোর ভৌগোলিক বণ্টন অত্যন্ত অসম। বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র দেশের ভূগর্ভে এই মূল্যবান সম্পদগুলো কুক্ষিগত রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন মারপ্যাঁচ তৈরি করেছে।
এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক খেলায় বর্তমান বিশ্বের একক ও সর্বেসর্বা পরাশক্তি হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করে আছে চীন। বিশ্বের মোট রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস উত্তোলনের বড় একটি অংশ এবং এর পরিশোধন বা রিফাইনিং খাতের প্রায় ৯০ শতাংশের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বেইজিংয়ের হাতে। অতীতে তেল বা গ্যাসের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর যে নিয়ন্ত্রণ ছিল, আজ সবুজ শক্তির এই যুগে এসে চীন ঠিক তেমনি এক কৌশলগত মোড়লে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বুঝতে পেরেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা প্রযুক্তিগতভাবে চীনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই উপলব্ধি থেকেই ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস এখন কাঁচামালের বিকল্প উৎস খুঁজতে এবং নিজেদের সাপ্লাই চেইন সুরক্ষিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, এই রেয়ার আর্থ এবং গ্রিন এনার্জির দখল লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মর্মান্তিক বলি হচ্ছে উন্নয়নশীল ও খনিজসমৃদ্ধ দরিদ্র দেশগুলো। আফ্রিকার কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির প্রধান উপাদান ‘কোবাল্ট’ উত্তোলনের ক্ষেত্রে যে অমানবিক শ্রম শোষণ ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে, তা একবিংশ শতাব্দীর নতুন উপনিবেশবাদের জলজ্যান্ত উদাহরণ। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে—বিশেষ করে চিলি, আর্জেন্টিনা ও বলিভিয়ার ‘লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল’-এ—চলছে পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গোপন লড়াই। খনিজ আহরণের নামে স্থানীয় জনপদ ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা হলেও এর সুফল ভোগ করছে উন্নত বিশ্বের বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো। পরিবেশ রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে শুরু হওয়া এই সবুজ রূপান্তর তাই শেষ পর্যন্ত কাঁচামালের নতুন সাম্রাজ্যবাদী কব্জায় বন্দি হয়ে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বা বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ এখন আর কেবল পরিবেশগত বা বিজ্ঞানের আলোচনার বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা ও আধিপত্যের হাতিয়ার। কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির আড়ালে পরাশক্তিগুলো মূলত নতুন যুগের বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের স্থান পাকা করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এনার্জি ট্রানজিশনের এই মারপ্যাচে যে দেশ যত বেশি খনিজ সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত একিউজিশন নিশ্চিত করতে পারবে, একবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বৈশ্বিক বিশ্বব্যবস্থার লাগাম মূলত তাদেরই হাতে থাকবে। জলবায়ু ভূ-রাজনীতির এই নির্মম খেলায় তাই পরিবেশ রক্ষার স্লোগানের নিচে লুকিয়ে রয়েছে বিশ্ব শাসনের এক তীব্র ও অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই।
(আগামীকাল ২৫শে অক্টোবর, পঁচিশতম পর্বে থাকছে: পানির ভূ-রাজনীতি: আন্তঃসীমান্ত নদী ও জল সংকটের ভবিষ্যৎ সংঘাত)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more