বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১০): ইউক্রেন সংকট, নেটো-রাশিয়া দ্বন্দ্ব ও ইউরোপের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা
অক্টোবর ১০, ২০২৬, ৬:০১ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১০, ২০২৬, ৬:০১ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১০): ইউক্রেন সংকট, নেটো-রাশিয়া দ্বন্দ্ব ও ইউরোপের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে 'বিশেষ সামরিক অভিযান' (Special Military Operation)-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, তখন বিশ্বরাজনীতি এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়। ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ ও সাঁজোয়া বহরের অগ্রযাত্রায় ইউক্রেনের কিয়েভ, খারকিভ ও ওডেসা সহ একাধিক শহর কেঁপে ওঠার মধ্য দিয়ে ইউরোপের দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার ভিত্তি চুরমার হয়ে যায়। কিন্তু এই অভূতপূর্ব সামরিক পদক্ষেপ কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল মূলত কয়েক দশক ধরে জমে থাকা ইউক্রেনের সার্বভৌম ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, ন্যাটো বাহিনীর পূর্বমুখী প্রসার এবং রাশিয়ার ঐতিহাসিক নিরাপত্তাশঙ্কার এক দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার চূড়ান্ত রূপ।
সংকটের ঐতিহাসিক মূল ও সোভিয়েত-উত্তর ব্যাকড্রপ এই সংকটের ঐতিহাসিক শিকড় প্রসারিত হয়ে আছে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং দ্বিমুখী বিশ্বব্যবস্থার অবসানের দিনগুলোতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইউক্রেন এবং বেলারুশকে তাদের পশ্চিমা সীমান্তের একটি নিরাপত্তা বলয় বা 'বাফার জোন' হিসেবে রাখা। ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে কিয়েভকে অর্থোডক্স পূর্ব-斯拉ভিক সভ্যতার সূতিকাগার মনে করে ক্রেমলিন। অন্যদিকে, তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিম ইউরোপীয় সহযোগীরা ১৯৯০ সালে জার্মান পুনরেকত্রীকরণের আলোচনায় ন্যাটোর সীমান্ত 'এক ইঞ্চিও পূর্বে প্রসারিত হবে না' মর্মে মস্কোকে মৌখিক আশ্বাস দিয়েছিল বলে রুশ পক্ষ দাবি করে থাকে। তবে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী তিন দশকে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা (NATO) একের পর এক সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। ১৯৯৯ সালে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্র; ২০০৪ সালে বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহ (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া) সহ আরও ৭টি পূর্ব ইউরোপীয় দেশ এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালের বুখারেস্ট সম্মেলনে ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ভবিষ্যতে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ক্রেমলিনের দৃষ্টিতে, মস্কোর নাকের ডগায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন পারমাণবিক ও সামরিক জোটের এই উপস্থিতি ছিল তাদের সার্বভৌম জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এক সরাসরি কৌশলগত হুমকি।
ইউরোমাইদান, ক্রিমিয়া ও ডনবাস সংঘাত (২০১৪) এই দীর্ঘদিনের উত্তেজনা একটি প্রত্যক্ষ সংকটে রূপ নেয় ২০১৪ সালে। ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সাথে পরিকল্পিত রাজনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে মস্কোর অর্থনৈতিক প্যাকেজ গ্রহণ করলে ইউক্রেনজুড়ে 'ইউরোমাইদান' (Euromaidan) আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলন তীব্র রূপ নিলে ইয়ানুকোভিচ রাশিয়াতে আশ্রয় নেন এবং কিয়েভে একটি পশ্চিমাপন্থী অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাশিয়া কালবিলম্ব না করে কৌশলগত স্থান ব্ল্যাক সি ফ্লিটের মূল কেন্দ্র ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অভিযান চালায় এবং বিতর্কিত গণভোটের মাধ্যমে ১৬ মার্চ ২০১৪ তারিখে ক্রিমিয়াকে রুশ ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত করে। একই সাথে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শিল্পাঞ্চল ডনবাসের (ডনেৎস্ক ও লুহানস্ক) প্রাক-রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা কিয়েভ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। এই সংঘাত প্রশমনে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় 'মিনস্ক-১' এবং 'মিনস্ক-২' চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে উভয় পক্ষের অনাগ্রহের কারণে সেখানে টানা আট বছর এক মৃদু প্রক্সি সংঘাত ও সীমান্তে যুদ্ধাবস্থা অব্যাহত থাকে।
পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া (২০২২) ২০২১ সালের শেষভাগে রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে প্রায় দেড় লক্ষাধিক সৈন্য ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করতে শুরু করে। ক্রেমলিনের প্রাথমিক দাবি ছিল—ইউক্রেনকে চিরতরে ন্যাটোর সদস্যপদ প্রদান থেকে বিরত রাখা, ন্যাটোর সীমানা ১৯৯৭ সালের পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং ইউক্রেন ভূখণ্ডে কোনো পশ্চিমাদের স্ট্র্যাটেজিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন না করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো এই দাবিগুলোকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পরিপন্থী উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করলে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ রাশিয়া ইউক্রেনের ডিনাজিমুক্তকরণ (Denazification) ও নিরস্ত্রীকরণের (Demilitarization) লক্ষ্য নিয়ে ত্রিভুজাকারে (উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে) পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্বাধীন কিয়েভ সরকার আত্মসমর্পণ না করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো অভূতপূর্ব হারে ইউক্রেনকে সর্বাধুনিক হাইমার্স (HIMARS), প্যাট্রিওট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আব্রামস ও চিতাবাঘ (Leopard) ট্যাঙ্ক প্রদান করে এবং অর্থনীতি সচল রাখতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ সহায়তা দেয়। রাশিয়াকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা 'SWIFT' থেকে রুশ ব্যাংকগুলোকে বাদ দেওয়া হয় এবং ইউরোপীয় বাজারে রুশ তেল-গ্যাসের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণ ইউক্রেন সংঘাত বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিকে আবার এক সংকটময় মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে: ১. ন্যাটোর নতুন সীমান্ত ও সম্প্রসারণ: দীর্ঘ দুই শতকের ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতার নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে বিসর্জন দিয়ে ফিনল্যান্ড (২০২৩) এবং সুইডেন (২০২৪) ন্যাটোর পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। এর ফলে রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর সীমান্ত দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাল্টিক সাগর মূলতঃ একটি ন্যাটো-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ২. জ্বালানি কূটনীতি ও অর্থনৈতিক রিশাফলিং: ইউরোপ রাশিয়া থেকে গ্যাস ও তেলের আমদানি প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়। এর বিপরীতে, রাশিয়া তার বিশাল খনিজ সম্পদ ও তেলের গতিপথ ঘুরিয়ে দেয় এশিয়ার দিকে—চীন ও ভারতের সাথে তাদের বাণিজ্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।
৩. চীন-রাশিয়া কৌশলগত নৈকট্য: পশ্চিমা অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখি হয়ে মস্কো ও বেইজিং নিজেদের মধ্যে 'সীমহীন অংশীদারিত্ব' (No-limits partnership) ঘোষণা করে, যা মার্কিন এক-মেরুভিত্তিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বিকল্প ব্লক তৈরিতে ত্বরান্বিত করেছে।
ইউক্রেন সংকট আজ কেবল ইউরেশিয়ার কোনো স্থানীয় সীমান্ত সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক নিয়মকানুনের শক্তি পরীক্ষা এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী একচ্ছত্র মার্কিন নিয়ন্ত্রণের সমাপ্তি ঘটিয়ে একটি বহুমুখী (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠার রক্তক্ষয়ী সূচনা নির্দেশ করে।
(আগামীকাল ১১ই অক্টোবর, একাদশ পর্বে থাকছে: লাতিন আমেরিকার ‘গোলাপী জোয়ার’ ও বামপন্থার পুনরুত্থান)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more