বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৩): মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: আব্রাহাম চুক্তি
অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ৭:৩৩ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ৭:৩৩ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৩): মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ: আব্রাহাম চুক্তি
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে দীর্ঘ সাত দশক ধরে যে নীতিটি অচল ও অপরিবর্তনীয় সত্য বলে গৃহীত হচ্ছিল, তা হলো—প্যালেস্টাইন সংকটের সমাধান ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে আরব বিশ্বের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরব-ইসরায়েল সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক মেরুকরণকে নিয়ন্ত্রিত করেছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে মার্কিন মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত 'আব্রাহাম আকর্ডস' (Abraham Accords) বা আব্রাহাম চুক্তি সেই ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে রাতারাতি পাল্টে দেয়। কোনো সরাসরি অঞ্চলভিত্তিক শান্তি আলোচনা কিংবা প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ছাড়াই সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), বাহরাইন, মরক্কো এবং সুদান ইসরায়েলের সাথে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যা পুরো অঞ্চলের পাওয়ার ডায়নামিক্সে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
আব্রাহাম চুক্তির নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাশঙ্কা। দীর্ঘকাল ধরে সুন্নি আরব দেশগুলো এবং শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের মধ্যকার যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তা এক সময় ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতকেও ছাপিয়ে যায়। তেহরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং ছায়া গোষ্ঠীগুলোর (Proxy Forces) প্রসার ঠেকাতে রিয়াদ, আবুধাবি এবং তেল আবিবের স্বার্থ এক বিন্দুতে মিলিত হয়। এই সাধারণ নিরাপত্তার অস্তিত্ব রক্ষায় পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে এক অপ্রকাশিত অক্ষ—যেখানে ইসরায়েলের সর্বাধুনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল আর্থিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব হাত মেলায়।
এই ভূ-রাজনৈতিক মোচড়ের পাশাপাশি ছিল গভীর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত হিসাব-নিকাশ। বিশ্বজুড়ে তেল-নির্ভর অর্থনীতির দিন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলো তাদের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার দিকে মনোযোগ দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ গবেষণা, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং উন্নত কৃষি প্রযুক্তিতে ইসরায়েলের বৈশ্বিক পারদর্শিতা উপসাগরীয় দেশগুলোর 'ভিশন ২০৩০'-এর লক্ষ্যগুলোর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। ফলে পুরনো মতাদর্শিক বৈরিতা পাশে সরিয়ে রেখে বাণিজ্যের নতুন দুয়ার উন্মোচনকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু হয়। হাজার হাজার কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ, সরাসরি বিমান যোগাযোগ এবং পর্যটন খাতের বিকাশ এই চুক্তিগুলোকে কেবল কাগজের চুক্তিতে সীমাবদ্ধ না রেখে এক বাস্তব রূপ দান করে।
তবে এই সম্পর্কের দ্রুত স্বাভাবিকীকরণের মূল্য সরাসরি দিতে হয়েছে প্যালেস্টাইনের সাধারণ মানুষকে। আব্রাহাম চুক্তির ফলে আরব বিশ্বের ঐতিহাসিক যে নীতি ছিল—'প্যালেস্টাইন ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে শান্তি'—তা কার্যত ভেঙে পড়ে। কিয়েভ থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন পর্যন্ত যখন সার্বভৌমত্বের নীতি নিয়ে সোচ্চার, তখন মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণে প্যালেস্টাইন ইস্যুটি কেবলই একটি গৌণ আঞ্চলিক সমস্যায় পরিণত হয়। এর ফলে প্যালেস্টাইনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও কৌশলগত একঘরে হয়ে পড়ার আশঙ্কা নতুন করে আঞ্চলিক সহিংসতা ও অস্থিরতার বীজ রোপণ করে।
আব্রাহাম চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, যা স্পষ্ট করে দেয় যে আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো বন্ধু বা শত্রু চিরস্থায়ী নয়—স্থায়ী কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এক-মেরুভিত্তিক ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-আরব অক্ষ তৈরির মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি বজায় রাখতে চাইলেও, চীন ও রাশিয়ার সাম্প্রতিক মধ্যস্থতা (যেমন চীন পরিচালিত সৌদি-ইরান কূটনৈতিক পুনর্মিলন) প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্য এখন কেবল একটি ব্লকের নিয়ন্ত্রণে নেই। আব্রাহাম চুক্তি একটি নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণ তৈরি করেছে সত্য, তবে প্যালেস্টাইন সংকটের ন্যায়সঙ্গত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more