বিডিফেস ডেক্স:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশের
প্রবীণতম দল হিসেবে দীর্ঘ ঐতিহ্য এবং টানা ১৭ বছর একক ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগের
একটি বড় ও স্থায়ী ভোটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর দলটির অনেক নেতা-কর্মী
আত্মগোপনে থাকলে ও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে তারা ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে
আসতে শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে দলটির কার্যক্রম বন্ধ। দলটির বর্তমানে কার্যকর নেতৃত্বশূন্য
হওয়ায় স্থানীয় বাস্তবতা ও স্বার্থকে কাজে লাগিয়ে এই ভোট আর নির্দিষ্ট কোনো এক দলের
হাতে কেন্দ্রীভূত নাও থাকতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ফলে আওয়ামী লীগের
স্থায়ী ভোটব্যাংক আসন্ন নির্বাচনে বড় একটি অনিশ্চিত কিন্তু নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে
পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ত্রয়োদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে এক নতুন
নির্বাচনী সমীকরণ। গত তিন দশকের ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-বাংলাদেশের রাজনীতিতে
আওয়ামী লীগের একটি শক্ত ও স্থায়ী ভোটব্যাংক সবসময়ই বিদ্যমান ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের
মতে, এই স্থায়ী ভোটই আসন্ন নির্বাচনে দলের জন্য সবচেয়ে বড় ‘ট্রাম্প কার্ড’ হয়ে উঠতে
পারে। তিন দশকে আ.লীগের ভোটব্যাংক : এক নজরে
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল
বিশ্লেষণে দেখা যায়-
১৯৯১ : ৩০%
১৯৯৬ : ৩৭%
২০০১ : ৪০%
২০০৮ : ৪৮%
গত ৩০ বছরে দলটির ভোটগ্রাফ
মোটামুটি ঊর্ধ্বমুখীই ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ
নির্বাচনে ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএনপিুজামায়াতের ভোটচিত্র
: হিসাবটা কোথায় দাঁড়ায়
বিএনপির চারটি জাতীয় নির্বাচনের
ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-
১৯৯১ : ৩০.৮%
১৯৯৬ : ৩৩.৬%
২০০১ (জোট) : ৪০.৯%
২০০৮ : ৩৩.২%
➡ গড় ভোট : প্রায় ৩৪.৬%
জামায়াতে ইসলামের ভোট
১৯৯১ : ১২.১%
২০০৮ : ৪.৭%
➡ গড় ভোট : প্রায় ৭.৪%
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
দীর্ঘদিন প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকলেও জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ও মাঠপর্যায়ের
প্রভাব কতটা সক্রিয়-তা আসন্ন নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
মোট ভোটার চিত্র-
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখের বেশি বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট
সূত্রগুলো ধারণা করছে।
পুরুষ ভোটার : প্রায় ৬ কোটি
২০ লাখ
নারী ভোটার : প্রায় ৬ কোটি
১০ লাখের বেশি
তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার : কয়েক
হাজার
বিশ্লেষকদের মতে, নারী ভোটারের
অংশগ্রহণ এবার অনেক আসনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ
ও উপকূলীয় অঞ্চলে।
তরুণ ও প্রথমবার ভোটার
: নির্বাচনের বড় অজানা। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ও অনিশ্চিত ফ্যাক্টর হিসেবে
উঠে আসছে তরুণ ভোটাররা। ধারণা করা হচ্ছে-
প্রথমবার ভোটার : প্রায়
দেড় কোটির কাছাকাছি
বয়সসীমা : ১৮-২৩ বছর
এই তরুণ ভোটারদের একটি বড়
অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আগ্রহী হলেও প্রার্থী নির্বাচন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি
ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে তারা দোদুল্যমান অবস্থানে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের
ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়লে পুরো নির্বাচনী হিসাবই বদলে যেতে পারে।
ভোটারদের তিন ভাগ : কোথায়
দাঁড়িয়ে কারা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সম্ভাব্য
ভোটারদের তিন ভাগে ভাগ করেছেন-
ক- নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ভোটার
মামলা-মোকদ্দমা, পেশাগত
ঝুঁকি বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে অনেক ভোটার এলাকায় শক্তিশালী ও সংগঠিত প্রার্থীকে
ভোট দিয়ে থাকেন। এই অংশের একটি বড় অংশ জামায়াতঘেঁষা প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে
মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
খ- আদর্শিক ভোটার
আওয়ামী লীগের কিছু আদর্শিক
ভোটার দলীয় অসন্তোষ, প্রার্থী পছন্দ না হওয়া কিংবা স্থানীয় সমীকরণের কারণে অনিচ্ছা
সত্ত্বেও বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারেন।
গ- হতাশ ভোটার
আওয়ামী লীগের স্থায়ী ভোটব্যাংকের
একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই অনুপস্থিত ভোটই নির্বাচনকে
সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
অর্ধেক ভোট সরে গেলেই বদলে
যেতে পারে চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, যদি আওয়ামী
লীগের ৩০-৪০ শতাংশ স্থায়ী ভোটের অর্ধেকও অন্যদিকে সরে যায়, তবে-বহু আসনে ফলাফল নাটকীয়ভাবে
পাল্টে যেতে পারে
বিএনপির বড় জয়ের সম্ভাবনা
তৈরি হতে পারে অথবা ২০০১ সালের মতো জামায়াত আবারও ‘কিংমেকার’ ভূমিকায় ফিরতে পারে। কোটি
ভোটার ও তরুণদের সিদ্ধান্তই নির্ধারক।
তিন দশকের নির্বাচনী পরিসংখ্যান
বলছে-ভোটের মাঠে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। প্রার্থী নির্বাচন, জোটের
সমীকরণ, নারী ও তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ, মাঠপর্যায়ের প্রচার এবং ভোটার উপস্থিতিএই সবকিছু
মিলিয়েই নির্ধারিত হবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত সমীকরণ।
বিডিফেস/গোলাম মোস্তফা