৫১তম জেল হত্যা দিবসে ফিরে দেখা সেই রক্তাক্ত ইতিহাস
নভেম্বর ০৩, ২০২৬, ২:২৮ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: নভেম্বর ০৩, ২০২৬, ২:২৮ এ.এম
৫১তম জেল হত্যা দিবসে ফিরে দেখা সেই রক্তাক্ত ইতিহাস
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ থেকে ৫১ বছর আগে, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে কারাগারে বন্দী অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে। একই দিনে মোশতাক-ফারুকের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থানের সূচনা করেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। সেদিন একটি বিমানে থাইল্যান্ডে চলে যান মেজর ডালিম, মেজর নূরসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই অভ্যুত্থান এবং কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা একই সূত্রে গাঁথা। আবার অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, এটি ছিল মোশতাক বাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত ব্লু-প্রিন্ট। কেউ বা বলেন, ডালিমদের নিরাপদে দেশত্যাগের (সেইফ এক্সিট) পরই এই হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোর ৩টায় তৎকালীন আইজি প্রিজন নুরুজ্জামান বঙ্গভবন থেকে বেশ কয়েকটি ফোন পান। মেজর রশীদ ও রাষ্ট্রপতি মোশতাক তাকে নির্দেশ দেন, রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নামে এক সেনাসদস্য জেলগেটে গেলে তাকে যেন সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়। দেশে তখন এক উত্তাল সময়—তার তিন মাস আগে ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে হত্যা করে সেনাবাহিনীর একাংশ।
সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বঙ্গভবন থেকেই দেশ পরিচালনা শুরু করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী কর্নেল রশীদ ও ফারুকদের সঙ্গে নিয়ে। তার শাসন আমলেই ২২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মনসুর আলী এবং আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
এই গ্রেপ্তারের দুই মাস ১৯ দিন পরে ৩ নভেম্বর সূচনা হয় সেই ভয়াল রাতের। একদিকে খালেদ মোশাররফ তখন পাল্টা অভ্যুত্থান করে মোশতাক-রশীদদের ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে কর্নেল ডালিমরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলের গেটে কড়া নাড়েন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ও তার বাহিনী।
একই জেলের সুবেদার আব্দুল ওয়াহিদ মৃধার ভাষ্যমতে, সে রাতে আড়াইটার দিকে হঠাৎ জেলখানায় পাগলা ঘণ্টা বাজে। কিছুক্ষণ পর তিনি খোঁজ নিতে জেলগেটে গিয়ে দেখেন, আর্মির কিছু সদস্য দাঁড়িয়ে আছে এবং আইজি ও ডিআইজিও সেখানে উপস্থিত। তাদের সামনেই জেলের সুবেদারের হাতে একটি কাগজ তুলে দিয়ে বলা হয়, সেটিতে থাকা কয়েদিদের একত্র করতে। কাগজে জাতীয় চার নেতা ছাড়াও আরও দু'জন নেতার নাম ছিল—আওয়ামী লীগ নেতা তোফাজ্জেল হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক।
সুবেদার মৃধা জানান যে শেষোক্ত দু'জন জেলে নেই। তখন তাকে বাকি চার নেতাকে একই সেলে একত্র করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম বন্দী ছিলেন জেলের ১ নম্বর সেলে; সেখানে কামরুজ্জামান ও মনসুর আলীকে আনা হয়। তারা সুবেদার মৃধাকে জিজ্ঞেস করেন, তাদের কেন ডাকা হয়েছে। তাজউদ্দীনের কন্যা এবং সাবেক সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমির সংগৃহীত বয়ানে সুবেদার মৃধা দাবি করেন, তিনি হত্যা ষড়যন্ত্রের কিছুই জানতেন না। চার নেতার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয়তো নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন হবে এবং তাদের শপথের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।
কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ হয়তো অন্য কিছু আশঙ্কা করেছিলেন। তিনি সঙ্গীদের বলেন, সময় বেশি নেই, আপনারা অজু করে নিন। চার নেতা অজু করে নজরুলের বিছানায় (চৌকিতে) বসেন। কিছুক্ষণ পরই চারজন সেনাসদস্য সেই সেলে ঢুকে পড়েন। সুবেদার মৃধা, আইজি ও ডিআইজিসহ সে রাতে উপস্থিত অন্যান্য পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্য অনুযায়ী, কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় ব্রাশফায়ার। সেনাসদস্যদের দল সাত রাউন্ড গুলি চালায়। ঝাঝরা হয়ে যায় তাদের দেহ, ছিদ্র হয়ে যায় কারাগারের দেয়াল, সেলের গরাদ বেঁকে যায় বহু স্থানে। এমনকি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জেলকক্ষের টেবিলে রাখা পবিত্র কোরআন শরিফও।
হত্যাকাণ্ড শেষে সেই সেনাদল কারাগার থেকে বের হয়ে যায়। এরপর নায়েব আলীর নেতৃত্বে আরেকটি দল সেলে প্রবেশ করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করে—জানান আইজি নুরুজ্জামান। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নজরুল ইসলাম ও কামরুজ্জামানের শরীরে বেয়নেটের আঘাতের উল্লেখ পাওয়া যায়। তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন জানান, সেদিন ভোর থেকে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত চার নেতার লাশ কারাগারের সেই কক্ষেই পড়েছিল এবং তাদের লাশ ঢাকা হয়েছিল নিজেদের ব্যবহৃত চাদর দিয়েই।
পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশে লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনার পরদিন মামলা দায়ের হলেও এর তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘ ২১ বছর বন্ধ থাকে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যা মামলার বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। দীর্ঘ আট বছর বিচার চলার পর ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর আদালত তিন পলাতক সাবেক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং পাঁচজনকে খালাস দেন।
এরপর ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্ট জেল হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছয় সামরিক কর্মকর্তাকে খালাস দেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ। ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় জড়িত থাকার দায়ে এই চারজনকে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
৩ নভেম্বরের এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়। মোশতাকের নির্দেশে সংঘটিত এই জেলহত্যা নিশ্চিত করেছিল যেন মুক্তিযুদ্ধের মূল কারিগর ও শীর্ষস্থানীয় এই নেতারা ভবিষ্যতে আর কখনো রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আসতে না পারেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মনসুর আলী এবং আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামান—প্রত্যেকেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তাদের সাহসিকতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
কারাগারে বন্দী অবস্থায় তাদের নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। জেল হত্যা দিবসে বিডিফেস ২৪ পরিবার তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more