বাউফলে পান চাষে ধস: ঋণের চাপে স্ট্রোকে মৃত্যু দুই চাষির

Date: 2025-12-17
news-banner

মু. অহিদুজ্জামান সুপন, বাউফল থেকে:

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পান চাষ আজ অস্তিত্ব সংকটে। বিদেশে পান রপ্তানি বন্ধ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজার ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে পান চাষে ভয়াবহ ধস নেমেছে। ঋণের চাপে স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়েছেন তিনজন পান চাষি, এর মধ্যে মারা গেছেন দু’জন। জীবন-জীবিকার সংকটে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন প্রায় তিন শতাধিক চাষি ও বারুই।

সরেজমিনে জানা যায়, উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা একসময় পরিচিত ছিল সবুজ পান-বরজের জনপদ হিসেবে। উপজেলার বিলবিলাস, গোসিংগা ও মদনপুরা গ্রাম ছিল পান চাষের জন্য বিখ্যাত। পান চাষকে কেন্দ্র করে শত বছর আগে সদর ইউনিয়নের বিলবিলাস হাটে গড়ে ওঠে দেশের অন্যতম পাইকারি পান বাজার, যা আজও ঐতিহ্য বহন করে চলছে।

প্রতিদিন ফজরের আজানের পরপরই বরজ মালিকরা পান নিয়ে আসতেন বিলবিলাস বাজারে। বরিশাল ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই পান কিনে গন্তব্যে ফিরতেন। সকাল ৮টার মধ্যেই শেষ হয়ে যেত এই ঐতিহ্যবাহী বাজার।

একসময় উপজেলার গ্রামগুলোতে সারি সারি পান বরজই বলে দিতো গ্রামের আর্থিক ভিত কতটা মজবুত ছিল। শতাব্দী ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বরজ মালিকরা পান চাষ করলেও দেশভাগের পর তারা এলাকা ছেড়ে গেলে বরজে কর্মরত মুসলিম চাষিরা (বারুই) স্বল্পমূল্যে বরজ কিনে পান চাষ চালিয়ে আসেন। বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ৩১০ জন পান চাষি থাকলেও তাদের বরজে কাজ করেন দুই সহস্রাধিক বারুই।

বাউফলের মদনপুরা, নাজিরপুর, কালাইয়া, চন্দ্রদ্বীপসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে নিয়মিত পান যেত বরিশাল ও ঢাকার পাইকারি বাজারে। উর্বর মাটি, অনুকূল আবহাওয়া ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে একসময় পান ছিল বাউফলের সবচেয়ে লাভজনক ফসল। সংসার পরিচালনা থেকে শুরু করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা—সবকিছুতেই কৃষকদের একমাত্র ভরসা ছিল পান চাষ।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই স্বর্ণযুগ এখন কেবল স্মৃতি। রোগবালাই, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, বাজারদরের অনিশ্চয়তা, শ্রমিক সংকট এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পান চাষ ক্রমেই কমে এসেছে। বর্তমানে পুরো উপজেলায় মাত্র ২৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে।

চাষিরা জানান, একটি বরজ তৈরি করতে কাঠ, বাঁশ, খুঁটি ও শ্রমিকসহ খরচ পড়ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অথচ বিক্রি করে আয় হচ্ছে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। সামান্য বৃষ্টি কিংবা জলাবদ্ধতায় বরজে দ্রুত পচন ধরে, ফলে অনেকেই বরজ তুলে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

বাজার ব্যবস্থায়ও রয়েছে চরম দুরবস্থা। নেই কোনো স্থায়ী পান সংগ্রহ কেন্দ্র। স্থানীয় বাজারে দালালদের নিয়ন্ত্রণে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চাষিরা। ঢাকাসহ বড় বাজারে পাঠাতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে খরচের পেছনে।

রোগবালাই দমনে চাষিরা ক্ষতিকর সালমোনেলা (ঝধষসড়হবষষধ) ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। অথচ অন্যান্য ফসলের মতো শত বছরের পুরোনো পান চাষের জন্য নেই কোনো সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, পানের রোগের কারণে বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দাম পড়ে গেছে। একই সঙ্গে বরজ তৈরির সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ফলে ঋণের চাপে অনেকেই পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাঙালি সমাজের ঐতিহ্যে মেহমানকে পান না দিলে সম্মান রক্ষা হতো না—এই সংস্কৃতি আজও গ্রামীণ সমাজে বহমান। স্থানীয়রা মনে করছেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে পান চাষে সরকারের জরুরি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিলন মিয়া বলেন, বিমানবন্দর প্লান্ট কোয়ারান্টাইন স্টেশনে পরীক্ষার সময় পানে সালমোনেলা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় বিদেশে রপ্তানি বন্ধ হয়েছে। পান চাষে বর্তমানে সরকারি কোনো প্রণোদনা নেই। তবে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পান চাষে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে শত বছরের এই ঐতিহ্য অচিরেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave Your Comments