বিশ্বে শান্তি থাকলে অস্ত্র বিক্রি থামবে, ধস নামবে মার্কিন অর্থনীতিতে!
Date: 2026-08-31
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ৬:৫৩ এ.এম
বিশ্বে শান্তি থাকলে অস্ত্র বিক্রি থামবে, ধস নামবে মার্কিন অর্থনীতিতে!
অ-অ+
বিশেষ আয়োজন:
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা সামরিক শক্তিধর দেশ হলেও বিগত কয়েক দশকে তারা যতগুলো যুদ্ধ করেছে তার প্রায় অধিকাংশ যুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র হেরেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ বা আফগানিস্তান যুদ্ধ আমেরিকার পরাজয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন প্রায় প্রতিটি যুদ্ধ থেকেই আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হয়েছে। আফগানিস্তানের যুদ্ধ একটি পরম বিপর্যয় হলেও মার্কিন সামরিক ঠিকাদারদের জন্য এটি ছিল একটি বাজিমাত করা প্রকল্প। এমনকি গাজা এবং ইউক্রেনের যুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সৈন্য না থাকলেও এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল মুনাফা করছে। সে কারণেই মূলত আমেরিকানরা যুদ্ধকে নিরস্ত মানুষের বিরুদ্ধে নির্মম হত্যাযজ্ঞ হিসেবে নয়, বরং অবাধে বিপুল টাকা কামানোর লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখে। এই বিষয়টির পোশাকী নাম হলো মিলিট্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, সংক্ষেপে এমআইসি (MIC)। যুদ্ধে হারজিত যাই হোক না কেন আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসায়ীরা সবসময়ই বিজয়ী হয়। পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধে কেন আমেরিকানরা হস্তক্ষেপ করে এবং যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে লাভবান হয় সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো বিডিফেস ২৪ (bdface24.com)-এর আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে।
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডুয়েট আইজেনহাওয়ার তার বিদায় ভাষণে এক ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আমেরিকার নিরাপত্তা আর অর্থনীতি রক্ষার জন্য যে বিশাল সামরিক যন্ত্র তৈরি হয়েছে তার সঙ্গে অস্ত্রশিল্পের অদৃশ্য এক বন্ধন তৈরি হচ্ছে।" এই বন্ধনকে তিনি মিলিট্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স বা সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স নামে ডাকেন। আইজেনহাওয়ার ভয় পেয়েছিলেন এই শক্তিশালী জোট যদি অজাচিত প্রভাব অথবা অতিরিক্ত ক্ষমতা পেয়ে যায় তাহলে মার্কিন গণতন্ত্রই বিপদের মুখে পড়তে পারে। সময়ের সঙ্গে তার সেই আশঙ্কা যে কতটা সত্যি হয়ে উঠেছে তা আজকের বাস্তবতায় অনেকটাই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স শুধু অস্ত্র বানিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতেও বড় ভূমিকা রাখে। ২০২৩ সালে দেখা গেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে, যার মধ্যে রেকর্ড ৭৬৫ বিলিয়ন ডলার এসেছে সরাসরি সরকারি চুক্তি থেকে। অর্থাৎ মার্কিন সরকার নিজেই এসব অস্ত্র কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ইসরায়েল কিংবা ইউক্রেনের মতো দেশে সামরিক সহায়তা পাঠায়, তখন অনেকেই ভাবেন সেই টাকা হয়তো সরাসরি সে দেশের সরকারের হাতে যায়। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি মোটেই সেরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া আর্থিক বা সামরিক সহায়তার বড় অংশই ফিরে আসে আমেরিকান অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোর পকেটে। তার মানে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সে দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকা পরোক্ষভাবে মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়। রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করার এক বছরের মাথায় মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেনারেল ডায়নামিক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে যায়। তারপর ইসরায়েল গাজায় হামলা শুরু করার পর আরেক মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা জায়ান্ট লকহিড মার্টিনের শেয়ারের দাম ৫৪ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। গাজা এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ চলাকালীন রেথিয়ন, বোয়িং, নর্থরপ গ্রুপের মতো সামরিক প্রতিরক্ষা সামগ্রী কোম্পানিগুলোর শেয়ার মূল্য এবং মুনাফাও আকাশ ছুঁয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিদেশী সাহায্য দিয়ে এসেছে, যা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে ঘটেনি। কিন্তু সেই অর্থও শর্তসাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলকে বলা হয় এই টাকার বড় অংশ আমেরিকান কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র কিনতেই খরচ করতে হবে। ফলে সেই অর্থ আবার ফিরে আসে লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন বা বোয়িংয়ের মতো কোম্পানিগুলোর কাছে। হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি বা ইরান যে পক্ষ থেকেই ইসরায়েলে মিসাইল ছোঁড়া হোক না কেন তাতে সবচেয়ে বেশি খুশি আর লাভবান হয় যুক্তরাষ্ট্রের রেথিয়ন; কারণ তারাই ইসরায়েলের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
যুক্তরাষ্ট্র একাই পুরো বিশ্বের প্রায় অর্ধেক অস্ত্র সরবরাহ করে। অর্থাৎ বিশ্বের মোট অস্ত্রের প্রায় ৫০ শতাংশই আসে আমেরিকার কাছ থেকে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি মার্কিন কোম্পানি পুরো বিশ্বের প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর প্রায় একচেটিয়া দখল করে বসে আছে। এরা হলো: লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, বোয়িং, নর্থরপ গ্রুমেন এবং জেনারেল ডায়নামিক্স। এদের একসাথে বলা হয় 'বিগ ফাইভ'। বিগ ফাইভের আধিপত্য বিস্তারের মূল লক্ষ্য হলো পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় যুদ্ধ থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করা। অনেকেই ভাবেন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো যুদ্ধ জেতার জন্য লড়াই করে, কিন্তু বাস্তবে তারা চায় যুদ্ধ যেন শেষ না হয় এবং অনন্তকাল যুদ্ধ চলতেই থাকে। আমেরিকার ইতিহাসে দীর্ঘতম যুদ্ধ হলো আফগানিস্তান যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ ছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর জন্য অন্তহীন মুনাফার ব্যবসায়িক মডেল। অথচ আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পরও দেখা গেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজেট একটুও কমেনি; বরং তিন বছরের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। এভাবে বিশ্বের বড় কোনো যুদ্ধ বন্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট কমে না, বরং বাড়তেই থাকে।
১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার সাথে শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মার্কিন সরকার ভাবছিল তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট কমানো দরকার। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে ৫১টি আলাদা আলাদা প্রতিরক্ষা কোম্পানি ছিল। মার্কিন সরকারের ইচ্ছা ছিল এগুলোকে একীভূত করে কম সংখ্যক কিন্তু বড় এবং আরো শক্তিশালী কোম্পানি তৈরি করা। সেই উদ্দেশ্যে পেন্টাগন ১৯৯৩ সালে শীর্ষ প্রতিরক্ষা নির্বাহীদের এক নৈশভোজে ডাক দেয়, যা পরবর্তীতে কুখ্যাত 'লাস্ট সাপার' নামে পরিচিত হয়। সেই ডিনারের পর থেকেই বড় বড় অস্ত্র কোম্পানিগুলো একীভূত হয়ে জন্ম নেয় বিগ ফাইভ। সেই থেকে বিগ ফাইভ শুধু মার্কিন অর্থনীতির ওপরই প্রভাব বিস্তার করেনি, বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্তের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র কোন দেশে যুদ্ধ করবে, কোথায় যুদ্ধে মধ্যস্থতা করবে, এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাথে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বা আচরণ কেমন হবে সেসব বিষয়ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে বিগ ফাইভ। অথচ এসব অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলো নিজেদের কাজকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছে, মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো এদের উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, "এবং যখন তাদেরকে বলা হয় তোমরা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না, তখন তারা বলে আমরা তো শুধুই শান্তি স্থাপনকারী।"
বিগ ফাইভ কোম্পানির বিশাল সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স শুধু অস্ত্র তৈরি করেই থেমে থাকে না, বরং তারা নিজেদের ব্যবসার নতুন বাজার খুঁজে পেতে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের লবিংয়ের সাথেও জড়িত থাকে। বিগ ফাইভ ন্যাটো সম্প্রসারণের পক্ষে ব্যাপক লবি করে। কারণ নতুন কোনো দেশ যখন ন্যাটোর সদস্য হয় তখন শর্ত অনুযায়ী সে দেশের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে হয়। আর আধুনিকায়ন মানেই হলো বিপুল পরিমাণে নতুন অস্ত্র কেনা। সাধারণত ন্যাটো সদস্যদের সেই অস্ত্রও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেই কিনতে হয়। বর্তমানে ন্যাটো জোটের তিন ভাগের দুই ভাগ অস্ত্রই সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র। এভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আর অস্ত্র ব্যবসা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। মার্কিন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে প্রতিবছর শত শত লবিস্ট নিয়োগ করে। ধারণা করা হয় বর্তমানে প্রায় ৭০০-রও বেশি লবিস্ট রয়েছে। তার মানে মার্কিন কংগ্রেসের প্রায় প্রতিটি সদস্যের জন্য একজনের বেশি লবিস্ট রয়েছে। ফলে কংগ্রেসে যখনই প্রতিরক্ষা নীতি বা বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়, তখন এই লবিস্টরা প্রকাশ্যে এবং গোপনে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এর চেয়েও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো মার্কিন কংগ্রেসে যেসকল বিশেষজ্ঞরা গিয়ে সাক্ষ্য দেয় তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানির পক্ষে লবি করার জন্য টাকা পায়। তাই যেসব নীতিকে আমেরিকার সাধারণ মানুষ তাদের দেশের নিরাপত্তার নীতি বলে মনে করে, তার প্রায় অধিকাংশই অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সুগভীর স্বার্থ বিবেচনা করে নেওয়া হয়। আর এই ব্যবসায়িক স্বার্থ শুধু রাজনীতিবিদ বা লবিস্টদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমেরিকার সামরিক বাহিনীর মধ্যেও রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর মধ্যে এমন এক প্রোগ্রাম চালু আছে যেখানে শত শত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বড় বড় অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিতে ইন্টার্নশিপ করে। তারপর তারা আবার সেনাবাহিনীতে সামরিক পদে ফিরে যায়। সেনাবাহিনীতে গিয়ে অস্ত্র কোম্পানির স্বার্থে কাজ করার পর তারা যখন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নেয়, তখন তারা গিয়ে বিগ ফাইভের নীতি-নির্ধারণী পদে চাকরি পায়। ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী আর অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন আর কোনো আলাদা সীমারেখা নেই। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ লাগিয়ে আমেরিকার সেনাবাহিনী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীরা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে চলেছে।
--মেহেদী হাসান
( এই আর্টিকেলটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে )
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more