বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৭): স্যাটেলাইট কূটনীতি: মহাকাশের নতুন সামরিকীকরণ
অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৪:২৮ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৪:২৮ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৭): স্যাটেলাইট কূটনীতি: মহাকাশের নতুন সামরিকীকরণ
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্নায়ুযুদ্ধের তুঙ্গে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার মহাকাশ প্রতিযোগিতা কেবল জাতীয় মর্যাদা ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষ প্রদর্শনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। চাঁদের মাটিতে মানুষের প্রথম পদার্পণ দিয়ে সেই পর্বের সমাপ্তি ঘটেছিল বলে মনে করা হলেও, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বরাজনীতিতে শুরু হয়েছে মহাকাশ বিজয়ের এক নতুন, গভীর ও বহুলাংশে বিপদসংকূল দ্বিতীয় অধ্যায়। বর্তমানের এই মহাকাশ প্রতিযোগিতা কেবল অনাবিষ্কৃত গ্রহ-উপগ্রহ খোঁজার বৈজ্ঞানিক রোমাঞ্চ নয়; বরং এটি রূপ নিয়েছে পৃথিবীর উপরিভাগের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সামরিক আধিপত্য এবং কৌশলগত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিনিয়ে নেওয়ার এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে এক নতুন শব্দবন্ধ—‘স্যাটেলাইট কূটনীতি’ ও ‘মহাকাশের সামরিকীকরণ’।
আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক নীতিতে স্যাটেলাইট ব্যবস্থার গুরুত্ব এখন নিঃশ্বাসের মতো অপরিহার্য। পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকা হাজার হাজার কৃত্রিম উপগ্রহ ছাড়া আজকের আধুনিক বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা, আর্থিক লেনদেন, জিপিএস নেভিগেশন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং সর্বোপরি সামরিক বাহিনীর রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স বা গোয়েন্দা নজরদারি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে। শত্রুপক্ষের সামরিক সচলতা পর্যবেক্ষণ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ট্র্যাকিং এবং রণক্ষেত্রে নির্ভুল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে স্যাটেলাইটই এখন পরাশক্তিগুলোর প্রধান ভরসা। ফলে কোনো যুদ্ধে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা মানেই সেই দেশকে সামরিক ও সামাজিকভাবে এক নিমেষে অন্ধ করে দেওয়া।
এই আশঙ্কার কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া মহাকাশকে যুদ্ধের নতুন সীমান্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটন তাদের সামরিক কাঠামোর অংশ হিসেবে ডেডিকেটেড ‘স্পেস ফোর্স’ (US Space Force) গঠন করেছে, আর বেইজিং ও মস্কো গড়ে তুলেছে নিজেদের কৌশলগত মহাকাশ কমান্ড। কক্ষপথে থাকা শত্রু স্যাটেলাইটকে লেজার দিয়ে অচল করে দেওয়া, সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে জ্যাম করে দেওয়া কিংবা সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে স্যাটেলাইট ধ্বংস করার ক্ষমতা (Anti-Satellite/ASAT weapons) প্রদর্শন করে পরাশক্তিগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, মহাকাশ আর কোনো নিষ্পক্ষ বা নিরাপদ অঞ্চল নয়। মহাকাশের এই সামরিকীকরণ পুরো বিশ্বের নিরাপত্তাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি স্যাটেলাইট এখন কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্পেসএক্স-এর 'স্টারলিংক'-এর মতো বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন কিংবা চীন ও রাশিয়ার তৈরি নিজস্ব গ্লোবাল নেভিগেশনাল সিস্টেম (যেমন চীনের 'বেইদাও' ও রাশিয়ার 'গ্লোনাস') উন্নয়নশীল ও মিত্র দেশগুলোকে সরবরাহ করে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নিজস্ব ব্লকের প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে। কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগপীড়িত অঞ্চলে সামরিক কিংবা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সুবিধা চালুর মাধ্যমে একটি পরাশক্তি যেভাবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে, তা স্যাটেলাইট কূটনীতির এক নতুন ও অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে চাঁদে ও গ্রহাণুতে লুকিয়ে থাকা অমূল্য খনিজ সম্পদের মালিকানা এবং নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তৈরির এক নতুন ইঁদুরদৌড়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন 'আর্টেমিস চুক্তি' এবং চীন-রাশিয়ার যৌথ চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রমাণ করে যে মহাকাশ এখন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের এক নতুন আয়না। ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তি আধুনিক যুগের স্যাটেলাইট আক্রমণ, মহাকাশের বাণিজ্যিক ব্যবহার কিংবা সামরিকীকরণ ঠেকানোর জন্য একেবারেই অপ্রতুল। একবিংশ শতাব্দীর বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বরাজনীতিতে তাই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আগামী দিনে যে শক্তি পৃথিবীর কক্ষপথ ও মহাকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, নিচের নীল গ্রহটিতে তাদের আধিপত্য ও সার্বভৌমত্বই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে।
(আগামীকাল ১৯ই অক্টোবর, অষ্টাদশ পর্বে থাকছে: আফ্রিকার খনিজ সম্পদ ও পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতা: গ্লোবাল সাউথের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more