বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৮): আফ্রিকার খনিজ সম্পদ ও পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতা
অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৪:৩৫ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৪:৩৫ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৮): আফ্রিকার খনিজ সম্পদ ও পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতা
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর আফ্রিকাকে বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে দীর্ঘকাল ধরে কেবল দারিদ্র্য, গৃহযুদ্ধ এবং মানবিক সংকটের অঞ্চল হিসেবে দেখা হতো। তবে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টরের যুগে এসে বিশ্ব মোড়লদের কাছে মহাদেশটির গুরুত্ব পুরোপুরি বদলে গেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), মোবাইল ফোন, উইন্ড টারবাইন, অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত অপরিহার্য খনিজ সম্পদের প্রধান ভাণ্ডার এখন এই আফ্রিকা। ফলে বিশ্ব শাসনের নতুন মেরুকরণে মহাদেশটি আর কোনো অবহেলিত প্রান্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল যুদ্ধক্ষেত্রে।
সবুজ জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জি ট্রানজিশনের এই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি যেসব ক্রিটিক্যাল মিনারেলস বা সংকটপূর্ণ খনিজ পদার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার সিংহভাগ ধারণ করে আছে আফ্রিকার মাটি। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (DRC) একাই বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি কোবাল্ট উৎপাদন করে, যা সব ধরনের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির প্রধান উপাদান। এছাড়াও ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কপার, নিকেল, মেটালার্জিকাল ক্রোমিয়াম এবং প্ল্যাটিনাম গ্রুপের ধাতুর এক বিশাল মজুদ লুকিয়ে আছে দক্ষিণ ও মধ্য আফ্রিকার ভূগর্ভে। প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখতে এই অমূল্য খনিজ সম্পদের ওপর নিরবচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য অস্তিত্বের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
এই অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী পদক্ষেপটি নিয়েছে চীন। 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর আওতায় আফ্রিকা জুড়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ভৌত অবকাঠামো, বন্দর, রেলপথ ও মাইনিং প্রজেক্টে অর্থায়ন করে বেইজিং আফ্রিকার খনিজ খাতের ওপর তাদের শক্তিশালী একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেছে। কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশের সিংহভাগ কোবাল্ট ও কপার খনি বর্তমানে চীনা রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। এই খনিজগুলো সরাসরি ফ্রন্টলাইন প্রসেসিংয়ের জন্য চীনে নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে বিশ্বব্যাপী ক্লিন এনার্জি সাপ্লাই চেইনের চাবিকাঠি এখন চীনের মুঠোয়।
চীনের এই আগ্রাসী অর্থনৈতিক প্রভাবের বিপরীতে পশ্চিমারা এখন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আফ্রিকায় চীনা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ খর্ব করতে 'লোবিতো করিডোর' (Lobito Corridor)-এর মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রজেক্টে বিনিয়োগ করছে, যাতে মধ্য আফ্রিকার খনিজ সম্পদ সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগরের বন্দরে পরিবহন করা যায়। অন্যদিকে রাশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা সহায়তা ও বেসরকারি সামরিক বাহিনী (যেমন ওয়াগনার গ্রুপ বা আফ্রিকান কোর) সরবরাহের বিনিময়ে স্বর্ণ, হীরা ও খনিজ উত্তোলনের চুক্তি হাসিল করে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে।
তবে এবারের চিত্রটি ঊনবিংশ শতাব্দীর 'স্ক্যাম্বল ফর আফ্রিকা' বা ঔপনিবেশিক দখলের মতো একপক্ষীয় নয়। গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বকারী আফ্রিকার নতুন প্রজন্মের নেতারা এখন আর কেবল কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান করতে রাজি নন। জিম্বাবুয়ে, নামিবিয়া এবং নাইজারের মতো দেশগুলো সম্প্রতি অপরিশোধিত খনিজ উপাদান সরাসরি দেশের বাইরে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের স্পষ্ট দাবি—খনিজ সম্পদ নিজ দেশেই প্রসেসিং ও ভ্যালু সংযোজন করতে হবে, যাতে তা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতিতে স্থায়ী অবদান রাখতে পারে। পরাশক্তিগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাজে লাগিয়ে আফ্রিকা এখন নিজের শর্তে বিশ্বরাজনীতির টেবিলে আসন নিশ্চিত করতে চাইছে।
খনিজ সম্পদের এই অভূতপূর্ব বৈশ্বিক চাহিদাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কার দিকে ঝুঁকবে। সুদূর ওয়াশিংটন, বেইজিং বা ব্রাসেলসের নীতি নির্ধারণী কক্ষ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি বাজারের প্রতিটি মোড় এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আফ্রিকার ভূগর্ভস্থ সম্পদের মাধ্যমে। একবিংশ শতাব্দীর বহু-মেরুভিত্তিক রাজনীতির নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রে তাই আফ্রিকা আর কেবল এক ভৌগোলিক সীমান্ত নয়; বরং এটিই বৈশ্বিক পরাশক্তিদের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র।
(আগামীকাল ১৯ই অক্টোবর, ১৯তম পর্বে থাকছে: প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ও নীল ভূ-রাজনীতি: ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিশাল প্রভাব)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more