বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৯): প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ও ভূ-রাজনীতি: ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিশাল প্রভাব
অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ৫:৫৪ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ৫:৫৪ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৯): প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ও ভূ-রাজনীতি: ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিশাল প্রভাব
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে প্যাসিফিক বা প্রশান্ত মহাসাগরকে এক বিশাল ও অন্তহীন জলরাশি বলে মনে হয়, যার মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দ্বীপগুলোকে একসময় বিশ্ব রাজনীতির চালচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন ও গুরুত্বহীন বিন্দুর মতো মনে করা হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান ভূ-রাজনীতিতে ফিজির মতো দ্বীপরাষ্ট্র কিংবা টুভালু, কিরিবাটি বা সলোমন দ্বীপপুঞ্জের মতো ক্ষুদ্র ভূখণ্ডগুলো এখন বিশ্ব মোড়লদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আয়তনে অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং নামমাত্র সামরিক শক্তি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও এই দ্বীপরাষ্ট্রগুলো আজ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতা প্রদর্শনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও লোভনীয় দাবা বোর্ডে রূপ নিয়েছে—যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় বলা হয় ‘ব্লু ডিপ্লোমসি’ বা ‘নীল ভূ-রাজনীতি’।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের মূলে রয়েছে বিশাল সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (EEZ)। ভৌগোলিক সীমানা ছোট হলেও এই দ্বীপগুলোর চারপাশে লক্ষ লক্ষ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে, যা মৎস্য সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা মহামূল্যবান পলিকৌলিক নোডিউল বা বিরল খনিজের এক বিশাল ভাণ্ডার। এর পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক ও কৌশলগত আধিপত্য বিস্তার, সাবমেরিন কমিউনিকেশন কেবল রুট রক্ষা এবং নৌবাহিনীর অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই দ্বীপগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
এই মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব বলয় সম্প্রসারণের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছে চীন। বেইজিং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে বিশাল অংকের অবকাঠামো ঋণ, বন্দর নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক চুক্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যে বড় ধরনের ফাটল ধরাচ্ছে। সলোমন দ্বীপপুঞ্জের সাথে চীনের নিরাপত্তা চুক্তি এবং অন্যান্য দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে চীনা প্রভাব বিস্তারের এই প্রচেষ্টা ওয়াশিংটন এবং এর মিত্র দেশগুলোকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ফলশ্রুতিতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থাকা এই অঞ্চলে তাদের কূটনৈতিক মিশন পুনরায় চালু করেছে এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সাথে মিলে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এই দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্ব আজ চরম বিপদের মুখে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সৃষ্ট সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিরিবাটি বা টুভালুর মতো নিচু দ্বীপগুলো মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পরাশক্তিগুলো যখন প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন এই দ্বীপগুলোর কাছে এটি কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, বরং এটি তাদের শারীরিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পরাশক্তিগুলো তাদের অনুগত করতে চাইছে, অন্যদিকে দ্বীপরাষ্ট্রের নেতারাও নিজেদের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্য পেতে এই কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগাচ্ছেন।
বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আটলান্টিক থেকে সরে এসে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, আর এই নতুন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো হয়ে উঠেছে নির্ণায়ক শক্তি। ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রগুলো আজ বিশ্ব রাজনীতিতে প্রমাণ করছে যে, ভূখণ্ডের আয়তন বড় না হলেও বিশ্ব শাসনের খেলায় তাদের অবস্থান এবং সমুদ্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব মোড়লদের ভাগ্য নির্ধারণে কতখানি প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
(আগামীকাল ২০শে অক্টোবর, বিংশ পর্বে থাকছে: ল্যাটিন আমেরিকা ও নতুন 'গোলাপী জোয়ার': মার্কিন উঠোনে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more