বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৮): চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য
অক্টোবর ০৮, ২০২৬, ৪:৫৪ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৮, ২০২৬, ৪:৫৪ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৮): চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিংশ শতাব্দীর শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব যখন 'এক-মেরু' মার্কিন আধিপত্যের যুগে প্রবেশ করেছিল, তখন প্রাচ্যের এক বিশাল ভূখণ্ড নীরবে প্রস্তুত হচ্ছিল বিশ্বরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল সমীকরণটাই বদলে দেওয়ার জন্য। গত তিন দশকে গণচীন বা চায়নার নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিকাশ কেবল এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকেই বদলে দেয়নি, বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী একক পশ্চিমা প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিশ্বকে পুনরায় এক 'বহু-মেরু' (Multipolar World) ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চীনের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, তৎকালীন ক্যারেসমেটিক নেতা ডেং জিয়াওপিংয়ের 'সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ' (Reform and Opening-up) নীতির মাধ্যমে। চীন তাদের বন্ধ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে ধাপে ধাপে বিশ্ববাজারের জন্য উন্মুক্ত করতে শুরু করে। তবে চীনের কৌশল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী—তারা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে 'বিশ্বের কারখানা' (Factory of the World) হিসেবে। সুলভ শ্রম, সুবিশাল অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টেনে নিয়ে চীন তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা এমন গতিতে ঘোরায়, যা মানবইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO)-এ চীনের যোগদান এই প্রবৃদ্ধিতে ঘি ঢালে, যার ফলে মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন তাদের এই অর্থনৈতিক শক্তিকে সরাসরি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রভাবে রূপান্তর করা শুরু করে। ২০১৩ সালে ঘোষিত চীনের ড্রিম প্রজেক্ট 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)—যা প্রাচীন সিল্ক রোডের আধুনিক সংস্করণ—পুরো বিশ্বের বাণিজ্য রুটকে বেইজিংয়ের সাথে সংযুক্ত করার এক বিশাল পরিকল্পনা। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার শতাধিক দেশে ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন কেবল তাদের বাণিজ্য পথকেই সুরক্ষিত করেনি, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বিশাল রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বিকল্প হিসেবে 'এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক' (AIIB) প্রতিষ্ঠা এবং ব্রিকস (BRICS) জোটকে শক্তিশালী করা—বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অর্থনীতির পর চীন মনোযোগ দিয়েছে তাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতে। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধভাবাপন্ন পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তি খাতে ফাইভ-জি (5G), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সেমিকন্ডাক্টরে ওয়াশিংটনের সমকক্ষ হয়ে ওঠা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন 'শীতল দ্বৈরথ' বা নিউ কোল্ড ওয়ারের জন্ম দিয়েছে। চীন এখন আর কেবল পণ্য উৎপাদনকারী কোনো দেশ নয়; তারা আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম নির্ধারণ এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল টেবিলে নিজেদের চেয়ার পাকা করে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই নতুন বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আধুনিক বিশ্বকে এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সৌদি আরব পুনর্মিলনে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা প্রমাণ করে যে, কেবল এশিয়া নয়, বৈশ্বিক কূটনীতিতেও চীনের প্রভাব এখন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এক-মেরুর বিশ্ব থেকে বহু-মেরুর বিশ্বে রূপান্তরের এই ঐতিহাসিক বাঁক কেবল বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেই পুনর্নির্ধারণ করেনি, বরং একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যৎ চিত্রনাট্য কেমন হবে—তা সম্পূর্ণ নতুন করে লিখে দিচ্ছে।
(আগামীকাল পর্ব ৯-এ থাকছে: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি: আরব বসন্ত, প্রক্সি যুদ্ধ ও ক্ষমতার পুনর্গঠন)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more