বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৫): নতুন শীতল যুদ্ধ: মেরু অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক লড়াই
অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৪:১২ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৪:১২ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১৫): নতুন শীতল যুদ্ধ: মেরু অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক লড়াই
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিশ্বের মানচিত্রের সর্বউত্তরের প্রান্ত, চিরহিমায়িত বরফে ঢাকা আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বসবাসের অযোগ্য এবং কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণার এক নির্জন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করেছে। হিমবাহের এই পলায়ন কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই ডেকে আনেনি, বরং বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে উন্মুক্ত করে দিয়েছে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক ময়দান। সুমেরুর নিচে লুকিয়ে থাকা কোটি কোটি ব্যারেল অপ্রতুল খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিরল খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নতুন সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট দখলের এই প্রতিযোগিতাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আখ্যায়িত করছেন ‘নতুন শীতল যুদ্ধ’ হিসেবে।
আর্কটিক অঞ্চলের এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মূল কারণ হলো এর তলদেশে লুকিয়ে থাকা অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের অনাবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং খনিজ তেলের ১৩ শতাংশ রয়েছে এই মেরু অঞ্চলে। এ ছাড়াও নিকেল, লোহা, তামা ও বিরল খনিজ সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে বরফের নিচে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন আর্কটিকের বরফ গলতে শুরু করেছে, তখন রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে এবং ডেনমার্কের মতো মেরুদেশীয় দেশগুলো (Arctic States) এই সম্পদের ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে রাশিয়া তাদের উত্তর উপকূলজুড়ে সামরিক ঘাটির আধুনিকায়ন এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত বরফ ভাঙার জাহাজ (Icebreakers) বহর বৃদ্ধি করে এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য সবচেয়ে জোরালোভাবে বিস্তার করেছে।
সম্পদের পাশাপাশি আর্কটিকের বরফ গলনের ফলে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট—নর্দান সি রুট (Northern Sea Route) এবং নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ (Northwest Passage)। ঐতিহ্যগতভাবে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য সুয়েজ খাল বা মালাক্কা প্রণালী ব্যবহার করতে হতো, যা হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। কিন্তু আর্কটিকের রুটগুলো সচল হওয়ায় এশিয়া থেকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার দূরপ্রাচ্য ও উত্তর ইউরোপের বাণিজ্য দূরত্ব এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এই রুটগুলোর ওপর যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, আগামী দিনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাপ্লাই চেইন তার মুঠোয় বন্দি থাকবে—এই বাস্তবতাই পরাশক্তিগুলোকে মেরু অঞ্চলে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের উপস্থিতি বাড়াতে বাধ্য করেছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কেবল আর্কটিকের তীরবর্তী দেশগুলোই নয়, বরং নিজেদের ‘নিকট-আর্কটিক রাষ্ট্র’ (Near-Arctic State) হিসেবে ঘোষণা করে মাঠে নেমে পড়েছে চীন। ‘পোলার সিল্ক রোড’ (Polar Silk Road) প্রকল্পের আওতায় চীন রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে, যা বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য রুট বৈচিত্র্যকরণের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের একটি অংশ। অন্যদিকে, ন্যাটো (NATO) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং চীনের কৌশলগত পদচারণাকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বলে মনে করছে। ফলে একসমays নির্জন ও শান্ত বরফের রাজ্যটি আজ বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল সামরিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন মানবজাতির জন্য জলবায়ুগতভাবে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা হলেও, পরাশক্তিগুলোর কাছে এটি বিশ্ব শাসনের নতুন চাবিকাঠি অর্જনের সুযোগ। পরিবেশ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসনকে পাশ কাটিয়ে এই মেরু অঞ্চলে একক আধিপত্য বিস্তারের যে উন্মাদনা শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনের বিশ্বকে এক নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সুমেরুর বরফ যতই গলছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে একবিংশ শতাব্দীর বহু-মেরুভিত্তিক রাজনীতির পরবর্তী বড় যুদ্ধের ময়দান হতে চলেছে এই উত্তর মেরু।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more