চুরির সম্পদে ভর্তি ব্রিটিশ মিউজিয়াম: ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুটের ইতিহাস
Date: 2026-07-29
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ২৯, ২০২৬, ১২:১৫ পি.এম
চুরির সম্পদে ভর্তি ব্রিটিশ মিউজিয়াম: ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুটের ইতিহাস
অ-অ+
বিডিফেস ২৪ এর বিশেষ আয়োজন:
"কোনো নারীর কাছে তার বয়স, পুরুষের কাছে তার বেতন, আর ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে তাদের ঐতিহাসিক প্রত্নসম্পদের উৎস সম্পর্কে কখনো জিজ্ঞেস করবেন না"—এটি আনুষ্ঠানিক কোনো প্রবাদ বাক্য না হলেও, চাটুকারিতা কিংবা ঠাট্টার ছলে প্রচলিত এই কথাটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অর্জিত সম্পদের পেছনের ইতিহাসকে এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে। ১৭৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও আকর্ষণীয় সংগ্রহশালা। সময়ের সাথে সাথে এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখেরও বেশি ঐতিহাসিক ও শৈল্পিক নিদর্শনের এক বিশাল খনিতে পরিণত হয়েছে। তবে এই সংগ্রহশালার দিকে তাকালে দেখা যায়, এর বেশিরভাগ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মই ইংল্যান্ডের নিজস্ব নয়, বরং বিশ্বের নানা দেশ থেকে সংগৃহীত।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের সব নিদর্শনই যে অবৈধভাবে সংগৃহীত, তা নয়। উদাহরণস্বরূপ, জাদুঘরে সংরক্ষিত ২ হাজার বছরের পুরোনো বিখ্যাত রোমান ফুলদানিটি ১৯৪৫ সালে এক ডিউকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিনে নেয় কর্তৃপক্ষ। এ জাতীয় নিদর্শনের ক্ষেত্রে মিউজিয়ামের আইনি ও বৈধ মালিকানার দাবি স্বীকৃত। তবে বাস্তবতা হলো, এই বিশাল সংগ্রহশালার একটি বড় অংশ কোনো কেনাকাটার মাধ্যমে আসেনি। এর পেছনের ইতিহাস মূলত রক্তের, স্বজন হারানোর আর ঔপনিবেশিক শোষণের। সপ্তদশ শতক থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যখন বিশ্বজুড়ে তাদের পরিধি বিস্তার করতে শুরু করে, তখন এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ধনসম্পদ ও প্রভাবশালী অঞ্চলগুলো দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রায় ২০০ বছর ভারতবর্ষ শাসনসহ একপর্যায়ে পুরো পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগ এলাকা ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। এই শাসন আমলেই বিজিত অঞ্চলগুলো থেকে অবাধে চালানো হয় লুটতরাজ ও চুরি। যেখানেই মূল্যবান কিছু পাওয়া গেছে, তা-ই বিজয়ী শক্তি হিসেবে তারা নিজেদের কুক্ষিগত করেছে। ভারতরত্ন 'কোহিনূর হীরা' এর অন্যতম বড় উদাহরণ, যা সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করা রানী এলিজাবেথের মুকুটে শোভা পেলেও এর প্রকৃত মালিকানা ভারতীয় উপমহাদেশের।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ঢুকলেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে 'রোজেটা স্টোন', যা ব্রিটিশ সেনারা ফরাসিদের কাছ থেকে দখল করেছিল, যদিও ঐতিহাসিকভাবে এর প্রকৃত উৎস ও মালিক মিশরীয় সভ্যতা। একইভাবে গ্রিসের এথেন্স থেকে দখল করে এক ব্রিটিশ শাসক নিয়ে আসেন 'পার্থেনন ভাস্কর্য', যা পরবর্তীতে এই জাদুঘরে জায়গা পায়। তবে আফ্রিকান শিল্পকলার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত সংগ্রহ হলো 'বেনিন ব্রোঞ্জ'। এটি একক কোনো মূর্তি নয়, বরং ব্রোঞ্জ ও পিতলের তৈরি হাজারো ভাস্কর্য ও ফলকের একটি সম্মিলিত সংগ্রহ। ষোড়শ শতাব্দী থেকে বর্তমান নাইজেরিয়ার অন্তর্গত তৎকালীন শক্তিশালী 'বেনিন সাম্রাজ্যে' ধর্মীয় উপাসনা ও অট্টালিকার শোভাবর্ধনে চমৎকার সব ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য তৈরি হতো। কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর মধ্যে আফ্রিকাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার চুক্তি (Scramble for Africa) অনুযায়ী বেনিন অঞ্চলটি পড়ে ব্রিটিশদের ভাগে।
১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশদের সাথে বেনিন সাম্রাজ্যের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে এবং বেনিনের সেনারা ৭ জন ব্রিটিশ দূত ও তাদের সঙ্গীদের হত্যা করে। এই ঘটনার প্রতিশোধ এবং একই সাথে বেনিনের অঢেল ধনসম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ রাজা ১২০০ সেনার এক বিশাল বাহিনী পাঠায়। ব্রিটিশ সেনারা পুরো বেনিন শহরকে আক্রমণ করে ধূলিসাৎ করে দেয়, তবে ধ্বংসযজ্ঞের আগেই প্রাসাদ ও উপাসনালয় থেকে সমস্ত মূল্যবান শিল্পকর্ম ও ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য লুট করে তারা। লুট করা বস্তুর স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিতে ব্রিটিশ সেনারা নিজেরাও 'Loot' শব্দটি লিখে রেখেছিল। পরবর্তীতে এসব সম্পদের একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং বড় একটি অংশ নিয়ে আসা হয় ইংল্যান্ডে। ১৯৬০ সালে নাইজেরিয়া স্বাধীনতা পেলেও বেনিনের সেই অমূল্য প্রত্নসম্পদ আর ফেরত পায়নি তারা। বর্তমানে এগুলো জার্মানির লাইপজিগ মিউজিয়াম, প্যারিসের কোয়াই ব্রানলি মিউজিয়াম এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
২০০০ সালের মার্চে বেনিন রাজপরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফেরত দেওয়ার আবেদন জানালেও ব্রিটিশ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে। মূলত ১৯৬৩ সালের ব্রিটিশ মিউজিয়াম আইন অনুযায়ী, এই জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনো বস্তু বা ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ফেরত দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। তবে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য বিবেচনা করে নিজ নিজ দেশের পূর্বপুরুষদের এসব ঐতিহ্য উদ্ধারে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৭ সালে গঠিত হয় 'বেনিন ডায়ালগ গ্রুপ', যারা পশ্চিমা জাদুঘরগুলো থেকে আফ্রিকান ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে কাজ করছে এবং ২০১৪ সালে এক ব্রিটিশ নাগরিক তার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া কিছু বেনিন নিদর্শন ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাজপরিবারের কাছে ফেরতও দেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব ও আইনি অজুহাতে ব্রিটিশ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত বেনিন ব্রোঞ্জসহ অন্যান্য দেশের বহু মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দাবি ও উদ্বেগের মুখে ঐতিহ্যবাহী এসব চুরি হওয়া সম্পদ কখনো নিজ দেশে ফিরবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more