স্টাফ রিপোর্টার: ১৪
নভেম্বর, শুক্রবার,২০২৫,
দেশজুড়ে অপহরণ এখন আর
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনাম হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে
অক্টোবর-এই ১০ মাসেই দেশে ৯২১টি অপহরণের মামলা রেকর্ড হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে তিনজনের
বেশি মানুষ অপহৃত হয়েছেন। এক বছরের ব্যবধানে অপহরণের হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় সাধারণ
মানুষের মনে অস্বস্তি ও আতঙ্ক বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই ১১০টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যা এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
জানুয়ারিতে ১০৫, ফেব্রুয়ারিতে ৭৮, মার্চে ৮৩, এপ্রিলে ৮৮, মে মাসে ৮২, জুনে ৮০, জুলাইয়ে
৯০, আগস্টে ৯০ এবং সেপ্টেম্বরে ৯৬ জন অপহৃত হন। গত বছর একই সময়ে অপহরণ হয়েছিল মোট ৫০১
জন,মাসিক গড়ে প্রায় ৫০ জন। চলতি বছরে সেই গড় দাঁড়িয়েছে ৯২ জনে।
অপহরণের ধরনে পরিবর্তন-
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী
বলছে, বেশির ভাগ অপহরণের পেছনে রয়েছে মুক্তিপণ আদায়, প্রতিশোধ, প্রেমঘটিত বিরোধ, ব্যবসায়িক
দ্বন্দ্ব এবং ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার। আগে রাতে অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটলেও এখন দিনের
বেলাতেও বাড়ছে এসব অপরাধ। রাইডশেয়ারিং, অনলাইন লেনদেন ও সামাজিক সম্পর্কের জাল ব্যবহার
করে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন,
সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাইবার অপরাধের বিস্তারের ফলে
অপহরণের মতো অপরাধ বাড়ছে। তাঁদের মতে, প্রকৃত অপহরণের সংখ্যা পুলিশের রেকর্ডের চেয়েও
বেশি, কারণ অনেক ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না।
অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন
চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “অপহরণের প্রকৃতি বদলে গেছে। মুক্তিপণ ছাড়াও এখন প্রতিশোধ,
প্রেম-বিবাদ ও ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে অপহরণ বাড়ছে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি
(মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “অপহরণের প্রতিটি ঘটনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব
দিয়ে তদন্ত চলছে। একাধিক অপহরণচক্র শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে
সংঘটিত অপহরণ ঠেকাতে সাইবার ইউনিটও কাজ করছে।” তিনি অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগে
সতর্ক থাকার এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে ৯৯৯-এ জানানোর পরামর্শ দেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি উল্লেখযোগ্য
অপহরণ-
ঢাকা: সর্বশেষ মঙ্গলবার
রাজধানীর দিয়াবাড়ী এলাকা থেকে ক্যামব্রিয়ান কলেজের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত রায়ের মরদেহ
উদ্ধার করে পুলিশ। ৭ নভেম্বর তাকে অপহরণ করা হয়; মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করা হয়েছিল ৮০
লাখ টাকা। টাকা না পাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
নওগাঁ: ২৪ অক্টোবর এক
ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ৭০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে একটি চক্র। র্যাব অভিযান চালিয়ে
তাকে উদ্ধার ও চক্রের হোতাকে গ্রেপ্তার করে।
ঢাকা-যাত্রাবাড়ী: গত
৩ অক্টোবর মো. মকবুল নামের এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। ৬০ হাজার টাকা
মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
টেকনাফ: ৩০ লাখ টাকা
মুক্তিপণ দাবিতে অপহৃত কলেজছাত্র হাসান শরীফকে র্যাব-১৫ অপহরণকারীদের আস্তানা থেকে
উদ্ধার করে।
উদ্বেগে সাধারণ মানুষ
অপহরণের ভয়াবহতা বাড়ায়
বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্কুল-কলেজগামী সন্তানদের নিরাপত্তা
নিয়ে তারা দুশ্চিন্তা প্রকাশ করছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান, জনসচেতনতা এবং
ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন
বিশেষজ্ঞরা।
তথ্য সূত্র : কালেরকন্ঠ