জ্বালানি সংকট ও ৬২ কেন্দ্রে বিপর্যয়: দেশজুড়ে রেকর্ড লোডশেডিং
Date: 2026-08-28
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ৪:১৮ এ.এম
জ্বালানি সংকট ও ৬২ কেন্দ্রে বিপর্যয়: দেশজুড়ে রেকর্ড লোডশেডিং
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
দেশে দীর্ঘদিনের তীব্র গ্যাস-সংকটের সঙ্গে কয়লা ও তরল জ্বালানির চরম সরবরাহস্বল্পতা যোগ হয়ে বিদ্যুৎ খাতে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর হঠাৎ কারিগরি বিভ্রাট ও পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া। এই বহুমুখী সংকটের কারণে দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টিরই উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র দেশজুড়ে তীব্র থেকে তীব্রতর লোডশেডিং দেখা দিয়েছে এবং সাধারণ জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সরকারি ৬৪টি, বেসরকারি ৭০টি এবং যৌথ উদ্যোগের ৩টি কেন্দ্র রয়েছে। বর্তমানে ব্যাহত হওয়া ৬২টি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ২০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ এবং বাকি ৪২টি কেন্দ্র সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম শক্তিতে উৎপাদনে রয়েছে। পিক আওয়ারে যেখানে প্রায় ১৬,৯৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, সেখানে সর্বোচ্চ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ১৩,২৮২ মেগাওয়াট। ফলে দিনে-রাতে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই বিশাল ঘাটতির কারণে জাতীয় গ্রিড সচল রাখতে বিতরণ সংস্থাগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভারী লোডশেডিংয়ের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ৮টি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের মোট ৭,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখান থেকে ৫,০০০ মেগাওয়াটের কম বিদ্যুৎ মিলছে। পায়রা ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে ইউনিট বন্ধ রয়েছে, আবার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে অচল রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রেও (যেমন আদানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র) প্রত্যাশিত শতভাগ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সেখান থেকেও কাঙ্ক্ষিত ব্যাকআপ পাওয়া যাচ্ছে না।
এই বিদ্যুৎ সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর এলাকার আবাসিক ভবনগুলোতে পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে জেনারেটর এবং সাধারণ মানুষ চরম গরমে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও করুণ, সেখানে দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। শিল্পখাতে—বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উৎপাদনশীল কারখানাগুলোতে জেনারেটর চালনার কারণে উৎপাদন খরচ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক কারখানায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট কেবল সাময়িক কোনো প্রাকৃতিক বা কারিগরি বিভ্রাট নয়, বরং এটি জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুততম সময়ে এলএনজি ও কয়লা আমদানির অর্থায়ন সুসংহত করা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বড় কেন্দ্রগুলোর ত্রুটি মেরামত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। পরিশেষে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, নীতিগত সংস্কার এবং অপচয় রোধের কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more