মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়: বাউফলে অভিনব প্রচারণায় সাড়া
Date: 2026-07-18
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১৮, ২০২৬, ১০:৫২ এ.এম
মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়: বাউফলে অভিনব প্রচারণায় সাড়া
অ-অ+
বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
মাদকের করাল গ্রাস থেকে সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে মুক্ত করতে পটুয়াখালীর বাউফলে এক অভিনব ও ব্যতিক্রমী জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের গৃহীত কঠোর মাদকবিরোধী অবস্থান ও আইনি বার্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গতকাল শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে বাউফল পৌর শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই প্রচারণা চালানো হয়। এই প্রচারণায় বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে নবপ্রণীত আইনের ওপর— যেখানে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে 'মৃত্যুদণ্ড'-এর বিধান রাখা হয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের এই বজ্রকঠিন বার্তা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগটি নিয়েছেন বাউফল উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সামুয়েল আহমেদ লেনিন। প্রচারণায় উল্লেখ করা হয়, মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন, মধ্যস্থতা বা লেনদেনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সম্প্রতি ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাস হয়েছে। এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ। তারা মনে করছেন, মাদকের ভয়াবহতা রোধে এটি একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ।
নিজের এই মানবিক উদ্যোগ সম্পর্কে সামুয়েল আহমেদ লেনিন বলেন, "মাদকের নীল দংশন আজ ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে যুগান্তকারী ও সাহসী আইন পাস করেছেন, তা সাধারণ মানুষের জানা অত্যন্ত জরুরি। আমি কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং সম্পূর্ণ মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এই প্রচারণা চালিয়েছি। মানুষ যদি আইনের কঠোরতা ও মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন হয়, তবে সমাজ থেকে এমনিতেই মাদক কমে আসবে। শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজনই পড়বে না।"
সামুয়েল আহমেদ লেনিনের এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি নানা সাহসী ও ভিন্নধর্মী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁর বাসভবনের প্রধান ফটকে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক পোস্টার শোভা পাচ্ছে, যা পথচারীদের সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করে। বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি নিজের বাড়ির প্রধান ফটকে "ভোট চাহিয়া লজ্জা দিবেন না" লেখা একটি ব্যানার টানিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। তৎকালীন বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বশির গাজী একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাঁর এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছিলেন, "ভোট দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। সামুয়েল আহমেদ লেনিন জনগণকে ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করেছেন, তাই উপজেলা প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।"
সেই স্মৃতি চারণ করে লেনিন সাংবাদিকদের জানান, "যেহেতু শেখ হাসিনার সরকারের আমলে মানুষের ভোটের কোনো মূল্য ছিল না, বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতেন এবং মৃত মানুষের ভোট দেওয়ার মতো প্রহসন ঘটত; তাই ভোট চাওয়ার বিষয়টি আমার কাছে চরম হাস্যকর মনে হয়েছিল। সেই নীরব ও তীব্র প্রতিবাদ জানাতেই আমি আমার বাড়ির ফটকে ওই ব্যানারটি টানিয়েছিলাম।"
এই ব্যতিক্রমী মাইকিং প্রচারণাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমদ। তিনি বলেন, "এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয় উদ্যোগ। সমাজ থেকে মাদকের অন্ধকার দূর করতে যার যার অবস্থান থেকে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হলে আমরা দ্রুতই একটি সুস্থ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।"
ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহমেদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অহিদুজ্জামান সুপন এই উদ্যোগকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, "সমাজের সচেতন নাগরিকদের উচিত এই উদ্যোগকে একটি গণ-আন্দোলনে রূপ দেওয়া। যত বেশি মানুষের কাছে মাদকের ভয়াবহতা ও এর সর্বোচ্চ শাস্তির বার্তা পৌঁছাবে, মানুষ তত বেশি সচেতন হবে।" বাউফল উপজেলা জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী লিটু সাহা মনে করেন, অভিভাবক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে সন্তানদের মাদকের কুফল ও কঠোর শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করার। প্রতিটি পরিবার যদি এই বার্তা নিজের মনে ধারণ করে, তবে সমাজে এর একটি ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, "অপরাধ দমনে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। গতকালের এই মাইকিং প্রচারণাটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। যারা মাদকবিরোধী সচেতনতায় কাজ করছেন, তাদের এমন উদ্যোগ সত্যিই অনুসরণযোগ্য। বাউফল থানা মাদক নিয়ন্ত্রণে আপসহীনভাবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে আমরা বদ্ধপরিকর।" পৌর এলাকার সাধারণ নাগরিক ও তরুণদের মতে, শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, administrations বা প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও যদি মাদকের কুফল ও আইনি কঠোরতার বার্তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে তরুণ প্রজন্ম আলোর পথে ফিরে আসবে। আর এভাবেই বাউফল তথা পুরো দেশ একদিন রূপ নেবে এক নিরাপদ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত সোনার বাংলায়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more