প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ৩০, ২০২৬, ৩:১৭ এ.এম
পবিত্র হজ: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পালনের নিয়মাবলী
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মুসলিমদের জীবনের অন্যতম বিশেষ আধ্যাত্মিক সফর হলো হজ। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ মুসলিম হজ পালন করে থাকেন, যার ফলে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানব জমায়েত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রতিবছর সবচেয়ে বেশি লোক হজ পালন করতে যায় এবং শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। খনিজ তেলের পরেই সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আদায়ের উৎস হলো এই হজ, যেখান থেকে দেশটি প্রতিবছর প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা আয় করে।
হজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। আভিধানিক অর্থে হজ হলো কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে করা, সংকল্প করা বা চক্রাকারে প্রদক্ষিণ করা। ইসলামের পরিভাষায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত কাজ সম্পাদন করার নামই হজ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলিমদের জীবনে অন্তত একবার এটি পালন করা আবশ্যক। হিজরি বর্ষপঞ্জির সর্বশেষ মাস জিলহজের ৮ থেকে ১২ তারিখ হজের জন্য নির্ধারিত সময়। বর্তমান প্রচলিত হজ নবীজির দেখানো পথে পালিত হলেও, আল্লাহর নির্দেশে সর্বপ্রথম এর প্রবর্তন করেছিলেন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত পৃথিবীর প্রথম ইমারত হলো পবিত্র কাবা গৃহ, যা ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালাম পুনর্নির্মাণ করে সর্বপ্রথম হজ পালন করেছিলেন।
মুসলমানরা বিদায়ী হজে নবীজির দেখানো পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ায় হজ পালন করে থাকেন। হজের সার্বিক অবস্থাকে 'ইহরাম' বলা হয়, যার প্রধান চিহ্ন দুই খণ্ড সেলাইবিহীন সাদা কাপড়। ইহরাম পরিধানের নির্দিষ্ট স্থান হলো 'মিকাত', যা সৃষ্টিকর্তার কাছে সকলের সমতা ও একতার প্রতীক। ইহরামে থাকা অবস্থায় ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। ইহরামের পর থেকে পুরো হজব্যায়ী 'তালবিয়াহ' নামক দোয়া পাঠ করা হয়। হজের পাশাপাশি ওমরাহও একটি বিশেষ তীর্থযাত্রা, যার নির্দিষ্ট কোনো দিনতারিখ নেই এবং বছরের যেকোনো সময় এটি করা যায়। কাবাঘর সাতবার তাওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার সাঈ করলেই ওমরাহ সম্পন্ন হয়। হজের পরম্পরার ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে হজ তিন প্রকার হতে পারে—হজে ইফরাদ, হজে কেরান এবং হজে তামাত্তু।
হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মসজিদুল হারামের কেন্দ্রে অবস্থিত কাবাঘর প্রদক্ষিণ বা তাওয়াফ। হজের মূল কাজ শুরু হয় ৮ জিলহজ থেকে এবং শেষ হয় ১২ জিলহজ। ৮ জিলহজ হাজিরা মক্কার কাছাকাছি উপশহর মিনায় পৌঁছান। এরপর ৯ জিলহজ সকালে মিনা থেকে রওনা হয়ে আরাফাতের প্রান্তরে পৌঁছাতে হয় এবং সেদিন সূর্যাস্তের পর হাজিরা মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ১০ জিলহজের মূল কাজ হলো শয়তানের বড় স্তম্ভে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করা, কুরবানি সম্পন্ন করা এবং মাথা মুণ্ডন করা। ১১ ও ১২ জিলহজে শয়তানের তিনটি স্তম্ভে সাতটি করে মোট ২১টি করে পাথর নিক্ষেপ করতে হয়। এই নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাজিরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন। এছাড়া মদিনায় গিয়ে মসজিদে নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করাও অত্যন্ত ফজিলতের।
হজ পালন করতে পারা প্রতিটি মুসলিমের জীবনের এক বিশেষ আধ্যাত্মিক অর্জন। বাংলা অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ব্রিটিশ আমল থেকেই মুম্বাই হয়ে জাহাজে চড়ে হজ করতে যেতেন। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে লক্ষাধিক মানুষ হজ পালন করেন। তবে এত বিশাল সংখ্যক মানুষের সমাগমের কারণে অতীতে বহুবার পদদলিত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটার নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তার ব্যাপক কড়াকড়ি এবং হাজীদের আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্নতা বজায় রাখতে পবিত্র স্থানে ক্যামেরা বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও তোলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম, হাজেরা আলাইহিস সালাম ও ইসমাইল আলাইহিস সালামের পুণ্যকর্মের স্মৃতিবিজড়িত এই হজের প্রতিটি আচার মুসলিম উম্মাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের ও একতার অনুপম শিক্ষা বহন করে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more