প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ০৯, ২০২৬, ৪:৩৩ এ.এম
পৃথিবীর ‘গোপন সরকার’ বিল্ডারবার্গ গ্রুপ
অ-অ+
বিশেষ প্রতিবেদন : গুপ্ত সংগঠন বা সিক্রেট সোসাইটির কথা উঠলেই সাধারণ মানুষের মাথায় সবার আগে আসে ‘ইলুমিনাতি’ কিংবা ‘ফ্রিমেসন’-এর নাম। কিন্তু এর বাইরেও বাস্তব পৃথিবীতে এমন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে, যাকে অনেকে পৃথিবীর ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ বা ‘গোপন সরকার’ বলে থাকেন। পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের এই মোর্চার নাম— বিল্ডারবার্গ গ্রুপ (Bilderbarg Group) প্রতি বছর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের, রাষ্ট্রপ্রধান, গোয়েন্দা প্রধান ও বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহীরা এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে কী আলোচনা হয়, তা বাইরের পৃথিবী জানতে পারে না। আর এই রহস্যই জন্ম দিয়েছে নানা রোমাঞ্চকর তত্ত্বের। কিভাবে এবং কেন শুরু হয়েছিল বিল্ডারবার্গ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
পর ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। সেই সময় পশ্চিম ইউরোপে মার্কিন-বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধছিল। এই দূরত্ব কমিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের প্রভাবশালী নেতাদের এক টেবিলে আনার উদ্যোগ নেন পোল্যান্ডের রাজনৈতিক উপদেষ্টা জোসেফ রেটিঙ্গার। তারই ধারাবাহিকতায়,
১৯সালে মে মাসে নেদারল্যান্ডসের ওস্টারবিক শহরের ‘হোটেল বিল্ডারবার্গ’-এ প্রথম একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। নেদারল্যান্ডসের প্রিন্স বার্নহার্ডের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেই প্রথম সম্মেলনের নামানুসারেই এই গোষ্ঠীর নাম হয়ে যায় ‘বিল্ডারবার্গ গ্রুপ’। প্রতি বছর বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতির গতিপথ ঠিক করতে এই গ্রুপ অন্তত একবার তিন দিনের এক বার্ষিক সম্মেলনে মিলিত হয়। কারা এই ক্লাবের সদস্য? বিল্ডারবার্গ গ্রুপ কোনো স্থায়ী সদস্যভিত্তিক
সংগঠন নয়। প্রতি বছরের বৈঠকের জন্য বিশ্বজুড়ে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ জন বিশেষ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমন্ত্রিতদের মধ্যে থাকেন: # ইউরোপ ও আমেরিকার বর্তমান ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান
ও শীর্ষ রাজনীতিক। # আইএমএফ (IMF), ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ন্যাটো (NATO) এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানগণ। # গুগল, মাইক্রোসফট, আমাজন, বিপি (BP), শেল (SELL)-এর মতো ট্রিলিয়ন ডলারের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের
প্রধান নির্বাহী বা সিইও। # সিআইএ (CIA) বা এমআইসিক্স (M16) এর মতো প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ। # বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যমের সম্পাদক বা মালিকপক্ষ (তবে তারা সেখানে সাংবাদিক হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত পরিচয়ে অংশ নেন)। কঠোর গোপনীয়তা: ‘চ্যাটাম হাউস রুলস’ বিল্ডারবার্গ মিটিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং রহস্যময় দিক হলো এর কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা। বৈঠকের স্থানটি কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে সেনাবাহিনী এবং স্নাইপার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। মূল আলোচনা কক্ষে কোনো মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা রেকর্ডিং ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এখানে কঠোরভাবে মেনে চলা হয় ‘চ্যাটাম হাউস রুলস’ (Chatham House Rule)। এই নিয়ম অনুযায়ী, বৈঠকের ভেতরে কে কী বলেছেন বা কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—তা বাইরের কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। মিটিং শেষে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা প্রেস কনফারেন্স করা হয় না। কোনো রেজুলেশন পাস বা ভোটভুটিও হয় না। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সমালোচক ও ষড়যন্ত্র গবেষকদের দাবি, বিল্ডারবার্গ গ্রুপ আসলে একটি ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ বা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। বলা হয়ে থাকে, এই গোপন বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনীতি, যুদ্ধ, মহামারি এবং জলবায়ু নীতির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যে খসড়া সিদ্ধান্ত হয়, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও নীতি-নির্ধারকেরা নিজেদের অজান্তেই তা বাস্তবায়ন করেন। অনেকের মতে, বিশ্বের বড় বড় রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পেছনে এই ক্লাবের পরোক্ষ হাত রয়েছে। যেমন— বিল্ডারবার্গ গ্রুপে আমন্ত্রিত হওয়ার পরই বিল ক্লিনটন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং টনি ব্লেয়ার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী
হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক মুদ্রা ‘ইউরো’ চালুর ধারণাও এই বিল্ডারবার্গ গ্রুপেরই মস্তিষ্কপ্রসূত বলে অনেকে দাবি করেন। #সমালোচনা ও বিতর্ক গণতন্ত্রের যুগে এমন এক গোপন বৈঠক নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন— যদি এই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সত্যিই মানবজাতির কল্যাণের জন্য আলোচনা করে থাকেন, তবে তা ক্যামেরার আড়ালে এবং এত গোপনীয়তার সাথে কেন করতে হবে? সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার এই গুটি কয়েক পুঁজিপতি ও রাজনীতিককে কে দিয়েছে? তবে বিল্ডারবার্গ
কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কেবলই একটি অনানুষ্ঠানিক মুক্ত আলোচনার মঞ্চ। এখানে নেতারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রটোকল বা মিডিয়ার চাপ ছাড়াই বিভিন্ন জটিল বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ পান, যা বর্তমান বিশ্বের বহুমুখী সংকট সমাধানে আড়ালে থেকে বড় ভূমিকা পালন করে। শেষ কথা বিল্ডারবার্গ গ্রুপ আসলেই পৃথিবীকে পর্দার আড়াল থেকে শাসন করছে, নাকি এটি কেবলই বিশ্বনেতাদের একটি বিলাসবহুল বার্ষিক আড্ডা—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে এটি অনস্বীকার্য যে, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১% মানুষের এই মিলনমেলা বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে এক বিশাল ও অদৃশ্য প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
(এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন উন্মুক্ত তথ্য, গবেষণা প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more