প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ৪:৫৮ এ.এম
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কালজয়ী মহামানব
অ-অ+
মহানবী সঃ
"মুহাম্মদ শব্দের অর্থই হলো প্রশংসিত। মুসলিমদের মতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর বার্তাবাহক এবং অমুসলিমদের মতে তিনি ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রবর্তক। ৫০০ সত্তর সালে পবিত্র মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে এই মহামানব জন্মগ্রহণ করেন।
অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় নেতা। কারণ তিনি আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছিলেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে বিডিফেস টুয়েন্টিফোরের আজকের আয়োজনে।
১৯৭৮ সালে সমকালীন ঐতিহাসিক এবং গণিতবিদ মাইকেল হার্ট বিখ্যাত কয়েকজন ইতিহাসবিদ এবং জীবনীগ্রন্থ লেখকদের সহায়তা একটি বই রচনা করেন। তাদের এই বই রচনার উদ্দেশ্য ছিল সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জন মনীষীর জীবনী সংকলন করা। অর্থাৎ যাদের কর্মের দ্বারা এই পৃথিবী সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। এই তালিকা তৈরি করতে তারা ৩২টি বিশেষ ক্যাটাগরি বা যোগ্যতার উপর নির্ভর করে।
মাইকেল হার্টের নেতৃত্বে গবেষকগণ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই তালিকায় এক নম্বরে রাখতে বাধ্য হয়। এ বিষয়ে কারো দ্বিমত পোষণ করার কোনো সুযোগও ছিল না। কারণ সকল ক্যাটাগরিতেই তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের যোগ্যতা বলে এই অবস্থান অর্জন করে নিয়েছেন।
মাইকেল হার্ট বলেছিলেন, 'আমি একজন খ্রিস্টান হিসেবে এই তালিকায় সবার উপরে যিশু খ্রিস্টকে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বেশ কয়েকটি যোগ্যতার অভাবের কারণে তাকে তালিকায় এক নম্বরে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ যিশু খ্রিস্ট কোনো রাষ্ট্রনায়ক, শাসক বা যোদ্ধা ছিলেন না। এমনকি যিশু খ্রিস্টের কোনো পরিবার বা স্ত্রী-সন্তানও ছিল না।' সেজন্য মাইকেল হার্ট সহ তার সহযোগী সকলে একবাক্যে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়—পৃথিবীতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমকক্ষ আর কেউ নেই।
মাইকেল হার্ট আরো বলেন, 'পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্বাচন করায় অনেকেই অবাক হয়েছে। কিন্তু সর্বকালের ইতিহাসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছেন।'
বিখ্যাত লেখক জর্জ বার্নার্ড শ' মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'মানবতার ত্রাণকর্তা' আখ্যা দিয়ে বলেন, 'তিনি যদি আধুনিক পৃথিবীর শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সকল সমস্যা সমাধান করতে সফল হতেন। সেই সাথে পৃথিবীর জন্য অতি জরুরি সুখ-শান্তিও আসত।' এছাড়াও অমুসলিম আরো বহু ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
বিগত প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে শত শত কোটি মুসলিম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা চর্চা করে আসছেন। অক্ষরজ্ঞানশূন্য একজন অনাথ শিশু, যে কিনা মরুভূমির কঠোর পরিবেশে পিতা-মাতা ছাড়া বড় হয়েছেন, তিনিই তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বর্বর এবং অনগ্রসর সমাজকে চরম উন্নত এক সভ্যতায় পরিণত করেছিলেন। তিনি একমাত্র দার্শনিক, যে কিনা তার জীবদ্দশায় নিজের দর্শনকে সমাজজীবনে শতভাগ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তিনি সারাজীবন ক্ষমা ও ঔদার্যের সাধনা করেছেন।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই বড় হন এবং তার সততার কারণে তৎকালীন সমাজের লোকজন তাকে 'বিশ্বাসী' উপাধি দিয়েছিল। কিন্তু তিনি যখন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত শান্তির বাণী প্রচার করতে শুরু করেন, তখন মক্কাবাসী ও নিজের আত্মীয়দের দ্বারা চরম নির্যাতিত হন। এরপর তাকে অন্যায়ভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচতে তিনি স্থায়ীভাবে মদিনায় বসবাস করতে শুরু করেন।
তার ২৩ বছর পর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফেরেন। সেসময় তিনি ইতিহাসের অন্যান্য বিজয়ী শাসকদের মতো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। বরং যারা তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, নির্মম অত্যাচার করেছে এবং তার অনুসারীদেরকে বিনা কারণে হত্যা করেছে, সেই বর্বর লোকদের উদ্দেশ্যে তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা শিক্ষা দিতেন, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তা নিজে বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তার মোহনীয় ব্যক্তিত্বের স্পর্শে সমগ্র আরব উপদ্বীপে শান্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি দেশ, একটি সরকারের আকারে। তিনি একজন অনাথ বালক থেকে বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও তার জীবনযাপনে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন আসেনি।
বিশাল রাজত্ব লাভের পরও তিনি আগে যেমন খাবার খেতেন, যেমন পোশাক পড়তেন, ঠিক তেমনটাই চালিয়ে গেছেন। তিনি কোনো প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। অতি সাধারণ মাদুর বিছিয়ে মাটিতে ঘুমিয়েছেন। এমনকি এত বড় একজন শাসক, তার জামা ছিঁড়ে গেলে নতুন জামা না নিয়ে নিজেই ছেঁড়া জামা সেলাই করে নিতেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত ন্যায়পরায়ণ এবং ন্যায্য শাসক। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো বিজয়ী শাসকের মতো তিনি তার রাজত্ব তার বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেননি। তিনি বিচার করার সময় তার বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজনদের প্রাধান্য দিতেন না। সকলের জন্য তার আইন ছিল সমান।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো মৃত্যুর পরের জীবনকে কেন্দ্র করে। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর উপাসনা করা ছিল তার প্রধান বার্তা। সেই সাথে পৃথিবীর সকল ধরনের অন্যায়-অত্যাচার সমূলে ধ্বংস করা ছিল তার লক্ষ্য। তিনি মানবজাতির এমন একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি সবসময় উত্তম চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিয়ে গেছেন এবং নিজের জীবনকে সর্বোত্তম চরিত্রের আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন।
রাজত্ব অর্জন করতে বা ধরে রাখতে তিনি কোনো কূটচক্রান্তের আশ্রয় নেননি। আর এখানেই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সকল শাসক থেকে আলাদা। তিনি জীবনে কোনোদিন তার কোনো স্ত্রী, চাকর, বন্ধু এমনকি শত্রুর গায়েও হাত তোলেননি। শুধুমাত্র সেই শত্রুদেরকেই তিনি মোকাবেলা করেছেন, যারা আল্লাহর হুকুম এবং তার বার্তার প্রতি সরাসরি বিরোধিতা করে তার উপর আক্রমণ করেছে। সেক্ষেত্রেও তিনি তা প্রতিহত করেছেন মাত্র।
সাধারণত কোনো সম্রাট বা শাসক নিজে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন না। কিন্তু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন দক্ষ সমরনায়ক এবং বীর অকুতোভয় যোদ্ধা; যিনি সৈন্যদলের পেছনে না থেকে সরাসরি শত্রুদের মাঝে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন। একই সাথে আবার তিনি ছিলেন শান্ত, মার্জিত এবং সকলের প্রতি আন্তরিক।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনের বেলা একজন শাসকের সকল দায়িত্ব পালন করতেন। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন, বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন, অতিথিদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, দরিদ্রদের খাবার দিতেন, অসুস্থকে দেখতে যেতেন, নিজের ব্যক্তিগত কাজ নিজেই করতেন। একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একজন শাসক যা যা করে, তার সবই করতেন। তারপর রাতের বেলা তিনি দীর্ঘ প্রার্থনায় মনোনিবেশ করতেন। প্রতি রাতে একটানা ৪-৫ ঘণ্টা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য তার পা ফুলে যেত। কিন্তু পরের দিন সকাল থেকে আবারও ইসলামী জীবনবিধান শিক্ষা দেওয়া, পবিত্র কুরআন ব্যাখ্যা করাসহ যাবতীয় কাজ নিরলসভাবে করে যেতেন। একজন মানুষ কীভাবে একসাথে সবগুলো কাজ সঠিকভাবে করতে পারে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া ইতিহাসে আর কারো এমন নজির নেই।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম কার্যকর মানবাধিকার চর্চা শুরু করেন। তার শাসনামলে একজন রাজা আর একজন দাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। পশ্চিমারা আজীবন বর্ণবাদের কুৎসিত চর্চা করে সাম্প্রতিক সময়ে খুব সাধু সাজার চেষ্টা করে, কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণবাদ বিলুপ্ত করেছিলেন আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। তিনি সেই প্রাচীনকালেই বলে গেছেন—কালো ও সাদার ওপর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শুধু তাই নয়, তৎকালীন সময়ে নারী অধিকার যখন সারা পৃথিবীতে উপেক্ষিত ছিল, নারীদেরকে অনেকাংশে যখন মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না, সেখানে তিনি নারীদেরকে সম্পত্তি লাভের অধিকার প্রদানসহ নানান ক্ষেত্রে নারী অধিকার নিশ্চিত করেছেন।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জীবনে কখনো কোনো মিথ্যা কথা বলেননি। কিন্তু এই মহামানবের প্রতি সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার হলো—তিনি নাকি পবিত্র কুরআন নিজে রচনা করেছেন! অথচ তিনি লেখাপড়াই জানতেন না। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় কুরআন তার রচনা, সেক্ষেত্রেও এই গ্রন্থজুড়ে তার নিজের গুণগান বেশি থাকার কথা ছিল। কিন্তু পবিত্র কুরআনে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনার চেয়ে ইহুদি ধর্মের নবী মুসা আলাইহিস সালাম এবং খ্রিস্টান ধর্মের নবী হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বা যিশু খ্রিস্টের বর্ণনাই বেশি এসেছে।
মুসলিম এবং অমুসলিম সকলেরই উচিত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার চেষ্টা করা। কেউ যদি মুক্তমন নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করে, তাহলে এই মহামানবের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগবেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ যে ব্যক্তি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে, সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী হতে বাধ্য। আমাদের সকলেরই উচিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের জীবন এবং কর্মকে অনুধাবন করে তাকে তার যোগ্য সম্মান দেওয়া।"
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more