এক সময় গ্রামবাংলার সকাল শুরু হতো নানা প্রজাতির পাখির কলতানে। সেই পরিচিত পাখিদের অন্যতম ছিল হলুদিয়া পাখি, যা কুটুম পাখি বা বেনেবউ নামেও পরিচিত। লোকগান, লোককথা ও গ্রামীণ সংস্কৃতিতে যার বিশেষ স্থান রয়েছে, সেই পাখিটি আজ প্রকৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নিরাপদ আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এ পাখির সংখ্যা দিন দিন কমছে।
হলুদিয়া পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Oriolus xanthornus এবং ইংরেজি নাম Black-hooded Oriole। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের বিচরণ রয়েছে। বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে একে হলুদিয়া, সোনাবউ, বেনেবউ ও কুটুম পাখি নামে ডাকা হয়।
পুরুষ হলুদিয়া পাখির সারা শরীর উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ রঙের। মাথা, গলা, ডানা ও লেজ কালো হওয়ায় এর সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে। ঠোঁট গোলাপি-লালচে এবং চোখের চারপাশে লালচে বৃত্ত থাকে। স্ত্রী পাখির রং তুলনামূলক ফ্যাকাশে ও সবুজাভ-হলুদ।
এক সময় পটুয়াখালীর বাউফলসহ দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামগুলোতে ভোরবেলা এ পাখির ডাক নিয়মিত শোনা যেত। গ্রামের প্রবীণদের বিশ্বাস ছিল, কুটুম পাখির ডাক শোনা মানেই বাড়িতে অতিথি আসবে। এ কারণেই পাখিটির নাম হয়ে যায় ‘কুটুম পাখি’। তেঁতুলিয়া নদী তীরবর্তী এলাকায় অনেকেই এর ডাককে ‘ও ভাই তোর কত ভোগ’ বলে কল্পনা করেন। যদিও এটি সম্পূর্ণ লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা।
লোককথায় রয়েছে, দুই ভাই জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে এক ভাই বাঘের আক্রমণে নিহত হন। অন্য ভাই অলৌকিকভাবে হলুদিয়া পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে সারাজীবন ভাইকে ডেকে বেড়ায়। যদিও এ কাহিনির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ।
এপ্রিল থেকে জুলাই মাস হলুদিয়া পাখির প্রজনন মৌসুম। স্ত্রী পাখি সাধারণত ২ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় পাখি মিলে বড় গাছের উঁচু ডালে ঝুলন্ত কাপের মতো বাসা তৈরি করে। ফল, ডুমুর, বট-পাকুড়ের ফল, ফুলের মধু, শুঁয়োপোকা, বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ও ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী এদের প্রধান খাদ্য। কৃষিজ ফসলের ক্ষতিকর অনেক পোকা খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রকৃতিবিদদের মতে, বড় গাছ কেটে ফেলা, বনভূমি উজাড়, ফলদ বৃক্ষ কমে যাওয়া, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হলুদিয়া পাখির আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস সংকুচিত হয়েছে। ফলে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুষদের ডিন ড. খোন্দকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "দেশের অনেক দেশীয় পাখি এখন আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। হলুদিয়া পাখির প্রধান খাদ্য ফল ও কীটপতঙ্গ। কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এসব খাদ্য বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বড় গাছ ও বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় তাদের নিরাপদ আবাসস্থলও নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে হলুদিয়া পাখি এখন খুব কম দেখা যায়।" প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, দেশীয় বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এ পাখিকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে গ্রামবাংলার এই অপরূপ হলুদিয়া বা কুটুম পাখি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু লোকগান, গল্প আর ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more