প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ১৯, ২০২৬, ৫:২৯ এ.এম
বিশ্ব অর্থনীতি যখন ৩ মাফিয়ার নিয়ন্ত্রনে
অ-অ+
বিশেষ প্রতিবেদন : সকালে ঘুম থেকে উঠে আইফোনে চোখ বোলানো, ফেসবুক স্ক্রল করা, নেসলে কফিতে চুমুক দেওয়া, কিংবা অফিসে যাওয়ার জন্য উবার ডাকা—আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এই প্রতিটি ধাপ আপাতদৃষ্টিতে আলাদা আলাদা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল মনে হতে পারে। এমনকি কোকাকোলা ও পেপসির বোতল হাতে নেওয়ার সময় আমরা ভাবি এরা একে অপরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু পর্দার পেছনের আসল সত্যটি শুনলে চমকে উঠতে হয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি, খাদ্য, বিনোদন এবং সেবা খাতের প্রায় সব বড় বড় কোম্পানির আসল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এদের বলা হয় "বিগ থ্রি"। এই তিনটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বা সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান হলো—ভ্যানগার্ড, ব্ল্যাকরক এবং স্টেট স্ট্রিট । বর্তমানে এই তিন প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত তহবিলের পরিমাণ প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ বাংলাদেশের ২০২৫ সালের মোট জিডিপিরচেয়ে প্রায় ৫৪ গুণ বেশি! কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী এই তিন পরাশক্তি সব সময় জনচক্ষুর আড়ালে ও গোপনে থাকতেই পছন্দ করে। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি কী এবং কীভাবে কাজ করে? ভ্যানগার্ড, ব্ল্যাকরক বা স্টেট স্ট্রিট নিজেরা কোনো পণ্য উৎপাদন করে না, কোনো কারখানাও চালায় না। এরা মূলত অন্যের অর্থ খাটিয়ে বিনিয়োগের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বের বড় বড় কর্পোরেশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ধনকুবেররা যখন নিজেদের অলস অর্থ সঠিক ও ঝুঁকিমুক্ত জায়গায় বিনিয়োগ করতে চান, তখন তারা শরণাপন্ন হন এই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর। কোথায় বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি কম এবং লাভ সবচেয়ে বেশি হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেয় এই বিগ থ্রি। বিনিময়ে তারা বিশাল অঙ্কের মুনাফার অংশ বা ফি পেয়ে থাকে। আর এই বিপুল পরিমাণ শেয়ারহোল্ডিংয়ের মাধ্যমেই প্রযুক্তি বাজার, কর্পোরেট দুনিয়া, এমনকি বিভিন্ন দেশের সরকারি নীতিতেও প্রভাব বিস্তার করে চলেছে তারা। মালিকানার এক জটিল গোলকধাঁধা এই তিনটি প্রতিষ্ঠানকে বাইরে থেকে আলাদা মনে হলেও, ভেতরের চিত্রটি একটি চক্রাকার গোলকধাঁধা। শেয়ারহোল্ডিংয়ের এক চতুর ছদ্মবেশে এরা একে অপরের সাথে মিশে আছে: ব্ল্যাকরক-এর উল্লেখযোগ্য শেয়ারের মালিক ভ্যানগার্ড এবং স্টেট স্ট্রিট। স্টেট স্ট্রিট-এর প্রধান শেয়ারহোল্ডারদের তালিকায় রয়েছে ব্ল্যাকরক ও ভ্যানগার্ড। আবার, ভ্যানগার্ড-এর ভেতরেও বড় অংশীদার হিসেবে রয়েছে ব্ল্যাকরক। এমনকি বাজারে কোকাকোলা ও পেপসিকে পরস্পরের কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হলেও, বাস্তবে এই দুটি ব্র্যান্ডেরই সিংহভাগ শেয়ার রয়েছে ভ্যানগার্ড এবং ব্ল্যাকরকের হাতে। ফলে বাজারে যে কোম্পানিই জিতুক না কেন, চূড়ান্ত মুনাফা যায় একই পকেটে। ল্যারি ফিংক ও ব্ল্যাকরকের ‘আলাদিন’ সুপার-সফটওয়্যার ১৯৮৬ সালে এক ভুল বিনিয়োগে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার লোকসান করার পর শিক্ষা নেন মার্কিন ইহুদি ব্যবসায়ী ল্যারি ফিংক। বন্ধুদের নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্ল্যাকরক’, যা আজ বিশ্বের বৃহত্তম গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট পাওয়ার হাউসে পরিণত হয়েছে। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময় আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ' দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বড় বড় কোম্পানির সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয় ব্ল্যাকরকের হাতে। ঠিক এই সময়েই ব্ল্যাকরক উদ্ভাবন করে 'আলাদিন' নামের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ডেটা-চালিত সফটওয়্যার। এই এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন সফটওয়্যারটি বিশ্ববাজারের নিখুঁত ঝুঁকির হিসাব ও লাভজনক ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারে। আজ অ্যাপল, মাইক্রোসফট এবং গুগলের মতো বিশ্বখ্যাত টেক জায়ান্টরা পর্যন্ত এই সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে শুধু এই সফটওয়্যারের ওপর ভিত্তি করেই ব্ল্যাকরক ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করছে। প্রথম ইনডেক্স ফান্ড ও ভ্যানগার্ডের উত্থান ১৯৭৫ সালে জন সি বোগল প্রতিষ্ঠা করেন 'ভ্যানগার্ড'। ১৯৭৬ সালে তারা বাজারে নিয়ে আসে বিশ্বের প্রথম কম খরচের 'এস অ্যান্ড পি ৫০০ ইনডেক্স ফান্ড' (ঝ্চ ৫০০ ওহফবী ঋঁহফ), যা মার্কিন শেয়ার বাজারের শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির রিটার্ন ট্র্যাক করত। ভ্যানগার্ডের একটি বিশেষত্ব হলো, এর কোনো একক মালিক নেই; এর সাধারণ বিনিয়োগকারী বা শেয়ারহোল্ডাররাই মূলত এর মালিক। বর্তমানে ১০.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করছে ভ্যানগার্ড। মজার ব্যাপার হলো, এটি টেক জায়ান্ট ব্ল্যাকরকেরও প্রায় ৮.৬৩% শেয়ারের মালিক। অন্যদিকে, ৪.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ পরিচালনাকারী 'স্টেট স্ট্রিট কর্পোরেশন'-এর ভেতরেও ভ্যানগার্ড (১৩.০৩%) এবং ব্ল্যাকরক (৮.৯৮%) নিজেদের বড় মালিকানা ধরে রেখেছে। যুদ্ধের অর্থনীতি: রক্তপাতেও বাড়ে মুনাফা! বিগ থ্রি-এর ক্ষমতার হাত শুধু সাধারণ পণ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়, এর বিস্তার রয়েছে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধক্ষেত্রেও। আমেরিকার শেয়ার বাজারের শীর্ষ ৫০০টি কোম্পানির প্রায় ৮৮ শতাংশের মালিক এই তিন প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ লাগলে বা বোমা পড়লে যেখানে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, সেখানে এই কোম্পানিগুলোর মুনাফা জ্যামিতিক হারে বাড়ে। কারণ, বিশ্বের শীর্ষ ৫টি অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, জেনারেল ডায়নামিক্স, নর্থ্রপ গ্রুম্যান এবং বোয়িং (যাদের একত্রে বিগ ফাইভ বলা হয়)—এদের সবার প্রধান শেয়ার বা মালিকানাও রয়েছে এই ব্ল্যাকরক, ভ্যানগার্ড ও স্টেট স্ট্রিটের হাতে। সমালোচকদের মতে, এই অস্ত্র ব্যবসা ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির মুনাফা সচল রাখতেই অনেক সময় বৈশ্বিক যুদ্ধনীতিতে প্রভাব খাটায় এই অদৃশ্য কর্পোরেট মাফিয়ারা। শেষ কথা প্রযুক্তি, মিডিয়া, খাদ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে মারণাস্ত্র—সবখানেই জড়িয়ে আছে ভ্যানগার্ড, ব্ল্যাকরক এবং স্টেট স্ট্রিটের অদৃশ্য সুতো। আমরা প্রতিদিন যা দেখছি, যা কিনছি এবং বিশ্বজুড়ে যা ঘটছে, তার সিংহভাগই মূলত এই তিন বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থেকে পুরো পৃথিবীকে পরিচালনা করার এই আধুনিক কর্পোরেট ব্যবস্থাপনাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
(এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন উন্মুক্ত তথ্য, গবেষণা প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more