বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১১): লাতিন আমেরিকার ‘গোলাপী জোয়ার’ ও বামপন্থার পুনরুত্থান
অক্টোবর ১১, ২০২৬, ৬:৫৩ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ৬:৫৩ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১১): লাতিন আমেরিকার ‘গোলাপী জোয়ার’ ও বামপন্থার পুনরুত্থান
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
বিংশ শতাব্দীর একটি বড় সময়জুড়ে লাতিন আমেরিকা অঞ্চলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাববলয়ের ভেতরে ‘পেছনের উঠান’ (Backyard) হিসেবে পরিচিত ছিল। ওয়াশিংটনভিত্তিক পুঁজিবাদী নীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতির কঠোর শর্ত এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ চরম বৈষম্য ও দারিদ্র্যের শিকার হয়েছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দক্ষিণ আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় পালাবদল ঘটে। মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্য ও নব্য-উদারবাদী (Neoliberalism) অর্থনৈতিক মডেলের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে লাতিন আমেরিকার জনপদ। ইতিহাসের পাতায় যা ‘গোলাপী জোয়ার’ বা ‘Pink Tide’ নামে পরিচিত—যেখানে একের পর এক দেশে গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় আসেন বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক নেতারা।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রথম বড় ধাক্কা আসে ১৯৯৮ সালে, যখন ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজের ক্ষমতারোহণ ঘটে। চাভেজ তার ‘বিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্র’ (Socialism of the 21st Century) স্লোগানকে সামনে রেখে দেশের বিশাল তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করেন এবং সেই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করেন দরিদ্র জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে।
ভেনেজুয়েলার এই সাফল্যের ঢেউ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মহাদেশের অন্যান্য দেশেও। একে একে ব্রাজিলে লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা, আর্জেন্টিনায় নেস্তর ও ক্রিস্টিনা কির্চনার, চিলিতে রিকার্দো লাগোস ও মিশেল ব্যাচেলেট, বলিভিয়ায় ইভো মোরালেস এবং ইকুয়েডরে রাফায়েল কর্রিয়া রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। এই সরকারগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন নির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর কঠোর ঋণ নীতি থেকে বেরিয়ে এসে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তারা ল্যাটিন আমেরিকার সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির লুণ্ঠন থেকে রক্ষা করে তা স্থানীয় জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের ওপর জোর দেয়। একই সাথে, ওয়াশিংটনের প্রভাবমুক্ত থেকে নিজস্ব আঞ্চলিক জোট যেমন—ইউনাসুর (UNASUR) এবং সেল্যাক (CELAC) গঠনের মাধ্যমে তারা মার্কিন প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান।
তবে এই ‘গোলাপী জোয়ার’-এর পথ মসৃণ ছিল না। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝিতে বিশ্ববাজারে পণ্যের (Commodities) দাম পতন, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ভেনেজুয়েলাসহ বেশ কিছু দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে। এর সুযোগ নিয়ে ব্রাজিলে জাইর বোলসোনারো কিংবা আর্জেন্টিনায় মাউরিসিও মাক্রির মতো উগ্র ডানপন্থী ও রক্ষণশীল নেতারা ক্ষমতায় এলে অনেকে এই ‘গোলাপী জোয়ার’-এর সমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু চরম অর্থনৈতিক সংকট, কোভিড-১৯ মহামারীর অবব্যবস্থাপনা ও অতি-ডানপন্থীদের জনবিরোধী নীতির কারণে লাতিন আমেরিকার জনগণ আবারও বামপন্থার দিকেই ফিরে যায়। ২০২২ সালের মধ্যে শুরু হয় ‘দ্বিতীয় গোলাপী জোয়ার’ (Second Pink Tide)। ব্রাজিলে লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন, চিলিতে তরুণ নেতা গ্যাব্রিয়েল বোরিক, কলম্বিয়ায় প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট হিসেবে গুস্তাভো পেত্রো এবং মেক্সিকোতে আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাদুরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকা আবার নতুন এক বামপন্থী জাগরণের সাক্ষী হয়।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে লাতিন আমেরিকার এই পুনরুত্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক-মেরুভিত্তিক মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বহু-মেরুভিত্তিক (Multipolar) বিশ্বে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এখন কেবল ওয়াশিংটনের নির্দেশ মেনে চলে না; বরং চীন ও রাশিয়ার সাথে কৌশলগত বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে।
(আগামীকাল ১২ই অক্টোবর, দ্বাদশ পর্বে থাকছে: আফ্রিকার 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' ও নব্য-উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াই)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more