১৮২৩ সালে প্রণীত ঐতিহাসিক 'মনরো নীতি' (Monroe Doctrine)-র পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলকে নিজেদের প্রভাব বলয় বা 'পেছনের উঠোন' (Backyard) হিসেবে গণ্য করে এসেছে। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং সরাসরি বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপে এই মহাদেশের রাজনীতি বহু দশক ধরে পরিচালিত হয়েছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এসে সেই চিত্র ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে বামপন্থী সরকারগুলোর ক্ষমতায় আসার নতুন রাজনৈতিক প্রবাহ মার্কিন একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই নতুন রাজনৈতিক স্রোত কেবল এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নীতিতেই পরিবর্তন আনেনি, বরং পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নিকট প্রতিবেশী অঞ্চলকে।
ল্যাটিন আমেরিকার এই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মূল প্রেরণা এসেছে অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, চরম দারিদ্র্য এবং ঔপনিবেশিক ধাঁচের মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে। ব্রাজিল, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, চিলি এবং আর্জেন্টিনার মতো প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোতে বাম ও মধ্য-বামপন্থী নেতাদের বিজয় এক স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে—ল্যাটিন আমেরিকা আর ওয়াশিংটনের তৈরি ভূ-রাজনৈতিক ছকে বন্দী থাকবে না। বিশেষ করে কলম্বিয়ার মতো ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র দেশেও প্রথমবারের মতো বামপন্থী সরকারের আগমন ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের জন্য এক বিরাট বড় ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই নতুন নেতৃত্ব নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ অত্যন্ত চতুরতার সাথে কাজে লাগিয়েছে ওয়াশিংটনের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর অধীনে চীন ল্যাটিন আমেরিকার অবকাঠামো খাত, বন্দর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। ব্রাজিলের সয়াবিন ও লোহা, চিলি ও পেরুর তামা এবং পুরো মহাদেশের জ্বালানি সম্পদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন বেইজিং। তদুপরি, ভবিষ্যতের গ্রিন এনার্জি বা সবুজ প্রযুক্তির সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান 'লিথিয়াম'-এর বিশ্বব্যাপী মজুদের সিংহভাগ ধারণ করে আছে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও চিলির সমন্বয়ে গঠিত 'লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল'। এই অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তাকে বড় ধরনের উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ছাপিয়ে ল্যাটিন আমেরিকায় মস্কো ও বেইজিংয়ের সামরিক ও নিরাপত্তাজনিত উপস্থিতিও দিন দিন দৃশ্যমান হচ্ছে। কিউবা, ভেনিজুয়েলা এবং নিকারাগুয়ার মতো ওয়াশিংটন-বিরোধী দেশগুলোর সাথে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা এবং যৌথ সামরিক মহড়া মার্কিন নিরাপত্তার জন্য নতুন এক চাপ সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটন যেসব দেশকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে, সেসব দেশ বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সহায়তা এবং মস্কোর রাজনৈতিক সমর্থনে টিকে থেকে নিজেদের ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রেখেছে। ফলে ল্যাটিন আমেরিকা এখন মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে নিজস্ব শর্তে বিশ্ব দরবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে।
ল্যাটিন আমেরিকার এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে 'গ্লোবাল সাউথ'-এর কণ্ঠস্বরকে আরো শক্তিশালী ও সুসংহত করছে। ব্রিকস (BRICS) ব্লকের পরিবর্ধন এবং আঞ্চলিক জোটগুলোর (যেমন CELAC ও UNASUR) পুনরুজ্জীবন প্রমাণ করে যে, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো এখন বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার সমর্থক। ওয়াশিংটনের পেছনের উঠোন হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলটি আজ বিশ্ব রাজনীতির নতুন ভারসাম্য নির্ধারণী শক্তি। মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে ফাটল ধরিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে—একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনৈতিক খেলায় ক্ষমতার একক কেন্দ্র আর ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী।
(আগামীকাল ২১শে অক্টোবর, একুশতম পর্বে থাকছে: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভারসাম্য: আব্রাহাম চুক্তি, ইরান-সৌদি সম্পর্ক ও মার্কিন প্রভাবের রূপান্তর)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more