বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৯): মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি: আরব বসন্ত, প্রক্সি যুদ্ধ ও ক্ষমতার পুনর্গঠন
অক্টোবর ০৯, ২০২৬, ৪:১৫ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৯, ২০২৬, ৪:১৫ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৯): মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি: আরব বসন্ত, প্রক্সি যুদ্ধ ও ক্ষমতার পুনর্গঠন
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
ক্ষোভের বহির্প্রকাশ মনে হলেও তা ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জমা হওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। তিউনিসিয়ার এই রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সীমান্ত পেরিয়ে মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন ও সিরিয়ায়। প্রথাগত দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক গণজাগরণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘আরব বসন্ত’ (Arab Spring) নামে চিহ্নিত হয়।
আরব বসন্তের সূচনায় তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জাইন এল আবিদিন বেন আলী এবং মিসরের দীর্ঘ ৩০ বছরের শাসক হোসনি মুবারক মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। অন্যদিকে, লিবিয়ায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মুয়াম্মার গাদ্দাফির অবসান ঘটে এবং ইয়েমেনে হস্তান্তরিত হয় ক্ষমতা। তবে, কোনো কোনো দেশে এই আন্দোলন গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথ দেখালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে ব্যর্থ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব, ধর্মীয় ও জাতিগত মেরুকরণ এবং সর্বোপরি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দ্রুতই এক জটিল অস্থিরতায় পরিণত হয়।
সিরিয়ার ক্ষেত্রে এই আন্দোলন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভয়াবহ রূপ নেয়। ২০১১ সালে আসাদ সরকারের সংস্কারবিরোধী কঠোর অবস্থান ও আন্দোলন দমনের পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনটি দ্রুত একটি বহুমাত্রিক গৃহযুদ্ধে মোড় নেয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দিতে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে ইরান ও রাশিয়া। বিশেষ করে ২০১৫ সালে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক বিমান অভিযান এবং লাতাকিয়ায় নৌ-ঘাঁটি জোরদার করার সিদ্ধান্ত সিরীয় যুদ্ধের ভারসাম্য আসাদের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, একই সাথে মস্কোকে মধ্যপ্রাচ্যের মূল ক্ষমতার টেবিলে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ বিরোধী দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লজিস্টিক ও সামরিক সহায়তা প্রদান করে। ফলে সিরিয়া পরিণত হয় এক বিশালাকার বৈশ্বিক প্রক্সি যুদ্ধের ময়দানে।
একই সময়ে, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের কৌশলকে কেন্দ্র করে শিয়া-সংখ্যাগুরু ইরান এবং সুন্নি-সংখ্যাগুরু সৌদি আরবের মধ্যে শুরু হয় এক পরোক্ষ স্নায়ুযুদ্ধ। উভয় দেশই নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকটে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। এর সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও করুণ পরিণতি দেখা যায় ইয়েমেনে। ২০১৪ সালে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করলে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জোট সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ বছরের এই সংঘাত ইয়েমেনকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। পাশাপাশি, সিরিয়া ও ইরাকের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সুযোগে ২০১৫ সাল নাগাদ তথাকথিত 'আইএসআইএস' (ISIS) তাদের খেলাফত ঘোষণা করে, যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য নতুন এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
তবে দুই দশকের রক্তক্ষয়ী অস্থিরতার পর, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক নতুন 'ক্ষমতার পুনর্গঠন' বা রিশাফলিংয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে অঞ্চলটির দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক নমনীয়তার নীতি গ্রহণ করছে। এই নতুন সমীকরণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ২০২৩ সালের মার্চে, যখন চীনের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরান পুনরায় পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবকে যেমন স্পষ্ট করে, তেমনি আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনেও ভূমিকা রাখে।
একই সাথে, ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত 'আব্রাহাম এগ্রিমেন্টস'-এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, যা এই অঞ্চলের কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে বড় পরিবর্তন আনে। যদিও ফিলিস্তিন সংকটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাত ও উত্তেজনা প্রমাণ করে যে, টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল। এক মেরু বা দ্বিমুখী আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছক পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক বহু-মেরু ও জটিল অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা সমীকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
(আগামীকাল পর্ব ১০-এ থাকছে: ইউক্রেন সংকট ও রাশিয়ার নতুন ভূ-রাজনৈতিক কৌশল)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more