বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৬): আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন ও নতুন জলপথের লড়াই
অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ৬:২১ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ৬:২১ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৬): আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলন ও নতুন জলপথের লড়াই
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
পৃথিবীর মানচিত্রের একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত বরফে ঢাকা রহস্যময় আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চল এতদিন বৈশ্বিক রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে বহু দূরে এক নির্জন প্রান্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। দুর্গম বরফাবৃত পরিবেশ, হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলটি ছিল মানুষের সাধারণ যাতায়াতের প্রায় সম্পূর্ণ বাইরে। অভিযাত্রী ও গবেষকদের দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন দল ছাড়া এখানে মানুষের তেমন কোনো স্থায়ী উপস্থিতি ছিল না। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া এবং একবিংশ শতাব্দীতে এসে তীব্র রূপ নেওয়া বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবে উত্তর মেরুর চিরহিমায়িত বরফের আস্তরণ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গলতে শুরু করেছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাসীকে যে মর্মান্তিক উষ্ণায়নের সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিলেন, পরাশক্তিগুলো সেই সংকটকে এক অদ্ভুত সুযোগ হিসেবে লুফে নিতে শুরু করেছে। আর্কটিকের বরফ গলে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া নতুন নতুন সামুদ্রিক রুট এবং এর ভূগর্ভে ও সমুদ্রতলে লুকিয়ে থাকা অমূল্য খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার দখল করার জন্য বিশ্বমঞ্চে শুরু হয়েছে এক রুদ্ধশ্বাস ও নিষ্ঠুর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।
আর্কটিক অঞ্চলের এই বরফ গলন কেবল পরিবেশগত পরিবর্তন নয়, এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রুট ও সমীকরণকে চিরতরে বদলে দেওয়ার উপক্রম করেছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনী এতদিন ছিল সুয়েজ খাল কিংবা আফ্রিকার দক্ষিণাংশের কেপ অব গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ পাড়ি দেওয়া। কিন্তু আর্কটিক সাগরের বরফ সরে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে ‘নর্দান সি রুট’ (Northern Sea Route), ‘নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ’ এবং ট্রান্স-পোলার সি রুটের মতো নতুন সামুদ্রিক জলপথ। এই নতুন শর্টকাট রুটগুলো ব্যবহার করলে এশিয়া থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পণ্য ও কন্টেইনার পৌঁছাতে প্রচলিত সুয়েজ রুট বা কেপ রুটের তুলনায় সময় এবং জ্বালানি খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। আর এই বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা ও বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে এক অদৃশ্য ও তীব্র জলপথ দখলের লড়াই।
এই মেরু প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় এবং আক্রমণাত্মক পরাশক্তি হিসেবে বর্তমানে এককভাবে আবির্ভূত হয়েছে রাশিয়া। নিজেদের দীর্ঘ উত্তর উপকূলের সুরক্ষাকে প্রধান কৌশলগত হাতিয়ার করে মস্কো আর্কটিক অঞ্চলে সোভিয়েত আমলের পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটিগুলো একের পর এক পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন করছে। পাশাপাশি, চরম বরফের মধ্যেও পথ চলার উপযোগী পারমাণবিক শক্তিচালিত শক্তিশালী বরফ ভাঙার জাহাজ বা ‘আইসব্রেকার’-এর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহর তৈরি করেছে রাশিয়া। উত্তর সাগরের এই রুটগুলোর ওপর একচ্ছত্র আইনি ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং এর মধ্য দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে ভারী টোল আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্য বাড়াতে বদ্ধপরিকর পুতিনের দেশ। মস্কোর এই নাটকীয় ও আগ্রাসী সামরিক উপস্থিতিতে চরম উদ্বেগে রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ন্যাটোভুক্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোও এখন হাত গুটিয়ে বসে নেই; তারা উত্তর মেরুতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে এবং যৌথ সামরিক মহড়া চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
বাণিজ্যিক জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ের পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলের অপার প্রাকৃতিক সম্পদের অন্তহীন ভাণ্ডারও পরাশক্তিগুলোকে পাগল করে তুলেছে। ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী, পৃথিবীর সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট সঞ্চয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা বিশাল একটি অংশ এই মেরু অঞ্চলের বরফের নিচে সুরক্ষিত অবস্থায় লুকিয়ে রয়েছে। এছাড়া বর্তমান বিশ্বের ইলেকট্রনিক্স, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং সবুজ প্রযুক্তির রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য বিরল মৃত্তিকা ধাতু বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস, বহুমূল্য সোনা, লোহা, জিঙ্ক এবং হিরের বিশাল সব খনির সন্ধান পাওয়া গেছে এই অঞ্চলে। আন্তর্জাতিক জলসীমা সংক্রান্ত আইন এবং জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশন (UNCLOS)-এর মারপ্যাচকে কাজে লাগিয়ে আর্কটিক কাউন্সিলের সদস্য রাষ্ট্রগুলো—রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ড—এই হিমায়িত ভূখণ্ডের মালিকানা এবং এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (EEZ) বাড়ানোর তীব্র আইনি ও কূটনৈতিক লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে। এমনকি এই অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে থেকেও উদীয়মান পরাশক্তি চীন নিজেদেরকে ‘কাছাকাছি আর্কটিক রাষ্ট্র’ বা নিয়ার-আর্কটিক স্টেট হিসেবে দাবি করে বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, গবেষণা স্টেশন স্থাপন এবং মেরু অঞ্চলের সিল্ক রোড গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে, যা নতুন এক বৈশ্বিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলের এই দ্রুত বরফ গলন কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ বা বাণিজ্যিক জলপথ উন্মুক্ত করছে না, বরং এটি সমগ্র মানব সভ্যতার জন্য এক ভয়ংকর ও সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত বিপর্যয়ের বার্তা নিয়ে আসছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের নিচু উপকূলীয় দেশ, বদ্বীপ অঞ্চল এবং ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো আগামী কয়েক দশকের মধ্যে চিরতরে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় মেরু ভাল্লুক, পেঙ্গুইনজাতীয় প্রাণী, সিল এবং অনন্য আর্কটিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা গোটা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ফেলছে। তবুও বৈশ্বিক জলবায়ু ধ্বংসের এই নির্মম ও বৈজ্ঞানিক সত্যকে নির্দ্বিধায় উপেক্ষা করে পরাশক্তিগুলো মেরু অঞ্চলের বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদের লোভ এবং ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের নেশায় নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি দিন দিন আরও বাড়িয়ে চলেছে। প্রকৃতির সবচেয়ে শীতল, শান্ত ও সংরক্ষিত এই মেরু অঞ্চলটি আজ মানব সভ্যতার লোভের কারণে পরিণত হয়েছে বিশ্ব শাসনের এক নতুন ও উত্তপ্ত রণাঙ্গনে।
(আগামীকাল ২৭শে অক্টোবর, সাতাশতম পর্বে থাকছে: সাইবার যুদ্ধ ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব: ফায়ারওয়ালের আড়ালে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য লড়াই)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more