প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ৫:৩৯ এ.এম
ফিলিস্তিন কেন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায় না?
অ-অ+
ফিলিস্তিনের ইতিহাস:
সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস হয়েছে। কিন্তু তারপরও হয়তো ফিলিস্তিন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে না। কারণ অতীতেও বহুবার ফিলিস্তিনের পক্ষে নানা প্রস্তাব পাস হলেও সেসব প্রস্তাব বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি।
ফিলিস্তিন কেন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে না এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলো বারবার কেন আটকে যায় সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে বিডিফেস টুয়েন্টিফোরের এই পর্বে।
২০১২ সাল থেকে ফিলিস্তিন জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকারী বা পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে রয়েছে। সহজ করে বলতে গেলে ফিলিস্তিন হলো জাতিসংঘের দর্শক। তারা অন্যান্য রাষ্ট্রের কার্যকলাপ দেখে। কিন্তু জাতিসংঘের কোন কার্যক্রমে তাদের মত প্রকাশ করার বা সদস্য রাষ্ট্রের মত কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করার অধিকার নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য দেশ ১৯৩টি। এদের মধ্যে ১৪৩টি দেশই ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তার মানে জাতিসংঘের প্রায় ৭৫ শতাংশ সদস্য ফিলিস্তিনকে পূর্ণ রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়ে একমত।
অন্যদিকে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মাত্র ৯টি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং আর্জেন্টিনা সহ আরো কয়েকটি অগুরুত্বপূর্ণ ছোট দেশ ফিলিস্তিনকে সদস্য করার বিপক্ষে রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং কানাডাসহ ২৫টি দেশ এই প্রস্তাবে ভোটদান থেকে বিরত ছিল।
জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব পাস হওয়ার জন্য ন্যূনতম ১১৮ ভোটের দরকার হয়। আশা করা হচ্ছিল ফিলিস্তিন হয়তো ১২০ থেকে ১৩০টির মতো ভোট পেতে পারে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ১৪৩ ভোট পড়ায় ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
কিন্তু এখানেই সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যায়নি। কারণ এই প্রস্তাবটি আবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাস হতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে আছে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিবে।
সাধারণ পরিষদের এই ভোটের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন জাতিসংঘে পূর্ণ সদস্যপদ না পেলেও এই রায় ফিলিস্তিনের পক্ষে একটি বৈশ্বিক স্বীকৃতি হিসেবে কাজ করবে। জাতিসংঘে প্রস্তাবটি এমন সময়ে পাস হয়েছে যখন ইউরোপীয় বেশ কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফিলিস্তিন জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারলেও এই স্বীকৃতির ফলে তারা বাড়তি কিছু সুবিধা ভোগ করতে পারবে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সাধারণ পরিষদের অন্যান্য সদস্য দেশের পাশে তারা আসন পাবে। সেই সাথে জাতিসংঘের যেকোনো বিতর্কে অংশগ্রহণ, এজেন্ডা প্রস্তাব এবং কমিটি নির্বাচনে প্রতিনিধি রাখতে পারবে ফিলিস্তিন। তবে এখনো কোনো প্রস্তাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে না তারা।
ভোটের আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের দূত রিয়াদ মনসুর বলেন, "আমরা শান্তি চাই। আমরা স্বাধীনতা চাই। একটা হ্যাঁ ভোট ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের ভোট। এটা কোনো রাষ্ট্রের বিপক্ষে নয়।"
অন্যদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের দূত গিলাদ এরদান বলেন, "জাতিসংঘ একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে স্বাগত জানালো।" অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি জাতিসংঘ সনদের একটি কপি ছিঁড়ে ফেলেন। তিনি জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনাদের অনেকেই ইহুদি বিদ্বেষী।" ইসরায়েলের দূত তার বক্তব্যের পুরোটা সময় জুড়ে এমন সব ভয়াবহ মিথ্যাচার করতে থাকে যা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হওয়ার পর তা চূড়ান্ত করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের ভোট দরকার হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ১৫টি দেশ। এদের মধ্যে ৫টি স্থায়ী সদস্য হলো— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন এবং ফ্রান্স। এবং বাকি ১০টি অস্থায়ী সদস্য পালাক্রমে ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে। যেকোনো প্রস্তাবে যদি একটি স্থায়ী সদস্য ভেটো প্রদান করে, তবে সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।
ফিলিস্তিন এখনো পর্যন্ত জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হতে পারেনি কেন? এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে না কেন? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর আসলে একই। আর তা হলো— জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার করেই ইসরায়েল যুগের পর যুগ ধরে ফিলিস্তিনে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, জাতিগত নিধন আর সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে।
মাত্র কিছুদিন আগেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির একটি প্রস্তাব উঠানো হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগে তা খারিজ হয়ে যায়। গাজায় ইসরায়েলের চালানো মানবতাবিরোধী যুদ্ধে এখনো পর্যন্ত ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেলেও ভয়াবহ এই যুদ্ধাপরাধ থামানো যাচ্ছে না। কারণ যতবারই গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উঠেছে, ততবারই যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। আমেরিকা শুধু গাজাবাসীর জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেই পার পেতে চাইছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, সমগ্র বিশ্ব ন্যায়ের পক্ষে থাকলেও জাতিসংঘকে জিম্মি করে যুক্তরাষ্ট্র একাই অন্যায় চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।
ফিলিস্তিনের সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্বের সকল দেশ একটি বিষয়ে একমত; আর তা হলো— 'টু-স্টেট সলিউশন' (Two-State Solution) বা দ্বিবিন্যাস রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে যখন প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড ভাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল, তখনই দ্বি-রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে বলা হয়। এই ব্যবস্থার অধীনে এই অঞ্চলে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার কথা ছিল। একটি দেশ হবে ইহুদিদের জন্য, যার নাম হবে ইসরায়েল। এবং অন্যটি হবে আরবদের জন্য, যার নাম হবে ফিলিস্তিন।
তারপর থেকে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ইহুদিরা ষড়যন্ত্র করে নিজেদের রাষ্ট্র গড়ে তুললেও তারা চায় না ফিলিস্তিনিরা নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করুক। তাদের যুক্তি হলো— এ ধরনের রাষ্ট্র গড়ে উঠলে তা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। তার মানে বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, চোর-ডাকাতরা দাবি করছে দেশে কোনো থানা-পুলিশ বা কারাগার নির্মাণ করা যাবে না, কারণ তা চোর-ডাকাতদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
ইসরায়েলের গডফাদার যুক্তরাষ্ট্রও লোকদেখানো সুরেই বলে থাকে তারাও 'টু-স্টেট সলিউশন' সমর্থন করে। তবে তাদের যুক্তি হলো— এই সমাধান আসতে হবে শুধুমাত্র ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু ইসরায়েল ফিলিস্তিনের কোনো প্রতিনিধির সাথে আলোচনা-ই করতে চায় না। এবং ইসরায়েল সরকার প্রকাশ্যেই বলে আসছে তারা ফিলিস্তিনকে কখনোই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে দিবে না। তার মানে আমেরিকাও চায় না ফিলিস্তিন স্বাধীন হোক। তারা শুধু কথার মারপ্যাঁচে বোঝাতে চাইছে তাদের এখানে কিছুই করার নেই।
কিছুদিন আগে যখন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার কথা আসে, তখন যুক্তরাষ্ট্র বলে— এখনো এটা করার সময় হয়নি। ৩৫ হাজারের বেশি লোক মারা যাওয়ার পর, ৮০ হাজার মানুষ মারাত্মক আহত হবার পর, ১৭ লক্ষ লোক ঘরবাড়ি হারানোর পর, ২২ লক্ষ মানুষ দিনরাত বোমা হামলার ঝুঁকিতে থাকার পরও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার সময় আসেনি?
তবে সত্যি কথা বলতে, ফিলিস্তিনকে যদি জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হিসেবে গ্রহণ করাও হয় এবং বিশ্বের সকল দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়, তবুও বাস্তবে আসলে ফিলিস্তিনবাসীর কোনো লাভ হবে না। কারণ ফিলিস্তিনের কোনো সার্বভৌম ভূখণ্ডই নেই। শুধু গাজা নয়, পশ্চিম তীরেরও সিংহভাগ অঞ্চল ইসরায়েলের দখলে। এই বিস্তৃত অঞ্চলে গড়ে ওঠা অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভেতরে ফিলিস্তিনিরা কয়েকটি ছিটমহলের মতো এলাকায় বসবাস করে। তাই পৃথিবীর বিষফোড়া ইসরায়েলকে এতদিন পর্যন্ত উচ্ছেদ করা না হবে, ততদিন পর্যন্ত শুধু ফিলিস্তিন নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এমনকি সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more