জাতিসংঘের ইতিহাস, পথচলা ও বর্তমান বিশ্বের নতুন চ্যালেঞ্জ
Date: 2026-09-23
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ৫:৩৮ এ.এম
জাতিসংঘের ইতিহাস, পথচলা ও বর্তমান বিশ্বের নতুন চ্যালেঞ্জ
অ-অ+
জাতিসংঘ:
বিশ্বের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে ইউনাইটেড নেশনস বা জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তর অবস্থিত। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সকল দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে জাতিসংঘ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে বিডিফেস এর আজকের আয়োজনে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল পথচলা বৈশ্বিক যেকোনো সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান, যুদ্ধ প্রতিরোধ ও যুদ্ধনীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে ১৯০৭ সালে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন। এখান থেকেই ৪৪টি দেশ একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এরপর ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৯ সালে প্যারিস সম্মেলনে একটি বিশ্ব সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। এরপর ১৪ দফার ভিত্তিতে ৪২টি প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে জাতিপুঞ্জ বা লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু ১৯৩৯ সালে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংসতম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে লিগ অব নেশনস অকার্যকর হয়ে পড়ে। বর্তমান জাতিসংঘ সেই সংগঠনটিরই উত্তরসূরি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট তার বন্ধু ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সাথে আলোচনায় সর্বপ্রথম 'জাতিসংঘ' নামটি উপস্থাপন করেন। একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালের ২৬শে জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ৫১টি দেশের প্রতিনিধি দ্বারা স্বাক্ষরিত জাতিসংঘ সনদ অনুমোদন পায়। এরপর একই বছরের ২৪শে অক্টোবর জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের যাত্রা শুরু করে। প্রতিবছর এই দিনটি সারা বিশ্বে 'জাতিসংঘ দিবস' হিসেবে পালিত হয়।
অধিবেশন, নেতৃত্ব ও মূলমন্ত্র ১৯৪৬ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডনের সেন্ট্রাল হল ওয়েস্টমিনস্টারে ৫১টি সদস্য রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের প্রথম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সর্বপ্রথম জাতিসংঘের মহাসচিব নিযুক্ত হন নরওয়ের ট্রিগভে লি। বর্তমানে জাতিসংঘের নবম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পর্তুগালের আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘের মূলমন্ত্র চারটি— আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সকলের অংশগ্রহণ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা অর্জন এবং এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হওয়া।
সাংগঠনিক কাঠামো ও দাপ্তরিক ভাষা জাতিসংঘ সনদের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো ৬টি অঙ্গসংগঠনে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো— সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, ওসি পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচারালয় এবং সচিবালয়।
এছাড়া বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেশ কিছু বিশেষায়িত সংস্থা কাজ করছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ইউনিসেফ বা জাতিসংঘ শিশু তহবিল, ইউনেস্কো বা জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা, এফএও বা খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, ডাব্লিউএইচও বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ডাব্লিউটিও বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা।
জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ৬টি। ভাষাগুলো হলো— ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, আরবি এবং মানদারিন। সদস্য রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অবস্থান
বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৩টি। ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান জাতিসংঘের সর্বশেষ রাষ্ট্র হিসেবে যোগদান করেছে। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে যোগদান করে। তার এক সপ্তাহ পর, ২৫শে সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তব্য প্রদান করেন।
জাতিসংঘের ইতিহাসে এই সংগঠনটি থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করা একমাত্র দেশ ইন্দোনেশিয়া। ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার সাথে দ্বন্দ্বের জের ধরে ইন্দোনেশিয়া জাতিসংঘ থেকে বেরিয়ে আসে। অবশ্য পরবর্তী বছরেই তারা পুনরায় সদস্যপদের জন্য আবেদন করে এবং আবারও তারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পায়।
সদর দপ্তর ও স্থাপত্য আমেরিকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী জন রকফেলারের অনুদানে ১৯ ৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সালব্যাপী নির্মাণকাজের পর নিউ ইয়র্কের ৭৬০ ফার্স্ট এভিনিউতে জাতিসংঘের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। মূল সদর দপ্তরের ২২ মিটার উঁচু এবং ১৮৯৮টি আসনবিশিষ্ট একটি কক্ষে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মূল কমপ্লেক্স ভবনটির নকশা করেছেন স্থপতি লে কারবুজিয়ে, অস্কার নাইমেয়ার এবং ওয়ালেস কে হ্যারিসন।
নিউ ইয়র্কের এই সদর দপ্তরটি ছাড়াও ১৯৪৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, ১৯৮০ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এবং ২০১১ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে জাতিসংঘের তিনটি শাখা সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্বশান্তি, টিকাদান ও মানবিক সহায়তা বিশ্বব্যাপী নির্বিচারে মানুষ হত্যা প্রতিরোধ এবং মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম জাতিসংঘে মানবাধিকার সনদ পাস হয়। জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডগুলোর মধ্যে মানবাধিকারের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা অন্যতম। বিভিন্ন মহাদেশে বেশ কয়েকটি অপারেশনের মাধ্যমে জাতিসংঘের হাজার হাজার শান্তিরক্ষী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।
বর্তমান বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থীদের জাতিসংঘ নিয়মিত বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করছে। দেশের প্রতিনিধি নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দমন করে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন দেশকে সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি মানুষকে খাদ্য ও খাদ্যসংক্রান্ত অন্যান্য সহায়তা প্রদান করছে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ১৯৮৮ সালের পর থেকে শিশুদের পোলিও রোগ নির্মূল করা হয়েছে। জাতিসংঘ এবং তার সংস্থাগুলো বিশ্বের অধিকাংশ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এনেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর হার বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।
টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু চুক্তি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে জাতিসংঘ একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সমস্ত দেশে দারিদ্র্য বিমোচন, অসমতা দূরীকরণ এবং পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী রাখার জন্য এই পরিকল্পনা প্রদান করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবসে ১৭৪টি দেশ নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষর করে। একদিনে এতগুলো দেশের অংশগ্রহণে এই বৃহৎ চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। অতীতে এতগুলো দেশ একই দিনে কোনো একটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন চ্যালেঞ্জ একবিংশ শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। একই সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের বিপজ্জনক বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ মোকাবিলায় আক্রান্ত দেশগুলোকে কার্যকর সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদানে কাজ করে চলেছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের সংস্কার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।
আফ্রিকা ও জাতিসংঘের ভূমিকা জাতিসংঘের সবচেয়ে বেশি সদস্য দেশ রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশে। এই মহাদেশেই জাতিসংঘের সবচেয়ে বেশি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশ জাতিসংঘের সদস্য। প্রাকৃতিক সম্পদের ঐশ্বর্য আফ্রিকা মহাদেশকে আশীর্বাদপুষ্ট করলেও দারিদ্র্য, গৃহযুদ্ধ আর মহামারি রোগ একই সাথে আফ্রিকা মহাদেশকে করে তুলেছে অভিশপ্ত। জাতিগত বিদ্বেষ থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের শিকার হয়েছে আফ্রিকার প্রায় সবকটি দেশ। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মহাদেশ মানব সভ্যতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more