প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ২১, ২০২৬, ৭:২৬ এ.এম
যোগ্য হয়েও কেন গোল্ডেন বুট পেলেন না লিওনেল মেসি?
অ-অ+
ফিফার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত | বিডিফেস:
পুরো টুর্নামেন্টে নেই কোনো গোল, নেই কোনো অ্যাসিস্ট। অথচ লিওনেল মেসির মতো ফুটবল জাদুকরকে পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সবচেয়ে মর্যাদািপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার গোল্ডেন বল জিতে নিয়েছেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রি। আটটি গোল, চারটি অ্যাসিস্ট এবং একটি সাদামাটা দলকে একাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে তোলার পরও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এবারের গোল্ডেন বলের মঞ্চে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ভূরাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি বড় হয়ে উঠেছে। সমালোচকদের তীর সরাসরি ফিফা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। গুঞ্জন রয়েছে, স্পেনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফাইনালের আগে ফুটবল বিশ্বের রথী-মহারথী থেকে শুরু করে ক্রীড়া সাংবাদিকরা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন যে গোল্ডেন বল উঠতে যাচ্ছে আর্জেন্টাইন তারকার হাতে। পরিসংখ্যানভিত্তিক ফুটবল বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান হুস্কোরের রেটিং অনুযায়ী, পুরো টুর্নামেন্টে ৮.৮২ গড় রেটিং নিয়ে সবার শীর্ষে ছিলেন লিওনেল মেসি। সেখানে ৭.৩০ রেটিং নিয়ে রদ্রির অবস্থান ছিল তালিকার ৩২ নম্বরে। মেসির পর এই পুরস্কারের দাবিদার হিসেবে কিলিয়ান এমবাপ্পের নামও আলোচনায় ছিল।
কিন্তু পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে রদ্রির নাম ঘোষণা করা হলে তা ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। স্পেনের সমর্থক বাদে অন্যান্য দলের ভক্ত ও বিশ্লেষকদের অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল অপ্রত্যাশিত।
রদ্রি স্পেনের মাঝমাঠে ৭৫৩টি সফল পাস দিয়ে দলের ইঞ্জিন হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন—এটি অনস্বীকার্য। তবে একটি পাসিং রেকর্ড বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য কতটা যথেষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যেখানে মেসি মাঠে দুর্দান্ত ড্রিবলিং ও জাদুকরী মুভমেন্ট প্রদর্শন করেছেন এবং একটি সাধারণ মানের দলকে ফাইনালে তুলেছেন, সেখানে রদ্রির ভূমিকা ছিল তুলনামূলক যান্ত্রিক ও সীমিত পরিসরের। যেখানে মেসি পাঁচটি ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়েছেন, সেখানে রদ্রি ম্যাচসেরা হয়েছেন একবার। ফিফার নিজস্ব পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়েও আক্রমণভাগে ও সৃজনশীলতায় মেসির অবস্থান রদ্রির চেয়ে অনেক উঁচুতে ছিল।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুলেছেন ফুটবল কিংবদন্তি জলাতন ইব্রাহিমোভিচ। তিনি ফিফার সিদ্ধান্তকে সমালোচনা করে বলেন, মেসি আরেকটি ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ উপহার দেওয়ার পরও মানদণ্ড বদলে ফেলা হয়েছে। টুর্নামেন্টকে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে যিনি সংজ্ঞায়িত করেছেন, পুরস্কার তারই পাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির প্রভাব থাকতে পারে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে স্পেনের সরব অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিছু বিষয়ে দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট রয়েছে। স্পেনের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় রাখতে এবং কৌশলগত বন্ধুত্ব বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপ আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় মার্কিন প্রশাসনের বৈশ্বিক কূটনীতির অংশ হিসেবেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অতীতেও নানা আলোচনা হয়েছে। বিশ্বকাপের শেষ ৩২ ম্যাচে মার্কিন ফরওয়ার্ড ফ্লোরিন বলোগুন লাল কার্ড পেয়ে নিষিদ্ধ হলেও পরে ফিফা তার শাস্তি এক বছরের জন্য স্থগিত করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন যে তিনি ফিফা সভাপতিকে ফোন করে এই লাল কার্ড তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। ফলে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে প্রশাসনিক প্রভাবের বিষয়টি নতুন নয়।
ফাইনালে রেফারিং নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছিল। আর্জেন্টিনা ও স্পেন প্রায় সমান ফাউল করলেও স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা কার্ডের হাত থেকে বেঁচে যান। দিন শেষে লিওনেল মেসির মতো খেলোয়াড়ের কাছে ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়েও বড় অর্জন তার ক্যারিয়ারের সাফল্য। তবে এই ধরনের সিদ্ধান্ত ফুটবলের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
ভবিষ্যতের তরুণ ফুটবলাররা মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকেও পর্যবেক্ষণ করবে। ফুটবল যদি কেবল ভূরাজনৈতিক মনস্তুষ্টির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে খেলার মূল পবিত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মেসি তার রেকর্ড ও পারফরম্যান্স দিয়ে আগেই ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত তার অর্জনকে ম্লান করতে পারে না।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more