প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: নভেম্বর ০৬, ২০২৬, ১:০৮ পি.এম
কতটা যৌক্তিক পোশাক শ্রমিকদের এই আন্দোলন?
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২,৫০০ টাকা করা হয়েছিল। সে সময় বেতন বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬.২৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকা করার দাবি প্রকাশে আসতে থাকে। অক্টোবরে এই দাবিতে সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ শুরু হয়। ১২ অক্টোবর থেকে রাজধানীর উত্তরায় টানা বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। অক্টোবর মাসের শেষ দিকে আন্দোলন বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ৩১ অক্টোবর থেকে সংঘর্ষ ও ব্যাপক কারখানা বন্ধের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠে। নতুন মজুরির দাবির পাশাপাশি শ্রমিকদের কালোতালিকাভুক্ত করা বন্ধ এবং চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহালের দাবিও রয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, মজুরি বোর্ড গঠনে দেরি এবং চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের যে ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে এটিও একজন শ্রমিকের মূল বেতন নয়। ২০২৩ সালে নিয়মিত শ্রমিক গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল মজুরি ছিল ৬,৭০০ টাকা। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া ৩,৩৫০ টাকা, চিকিৎসা ৭৫০ টাকা, যাতায়াত ৪৫০ টাকা এবং খাদ্যভাতা ১,২৫০ টাকা মিলিয়ে মোট মজুরি হয় ১২,৫০০ টাকা। তার মানে মূল বেতনের বাইরে আবার আলাদা আলাদা করে ভাতাগুলো যোগ হবে না। সকল ভাতা মিলিয়েই মোট মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তবে সব শ্রমিক অবশ্য এত কম টাকা বেতন পায় না। কাজের গ্রেড, অভিজ্ঞতা, বার্ষিক বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক মিলিয়ে সবার আয়ই কমবেশি আলাদা। এছাড়া বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার ৯ শতাংশ করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু বার্ষিক বৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরি এক বিষয় নয়। অতিরিক্ত সময় কাজ করলে একজন শ্রমিক হাতে কিছুটা বাড়তি টাকা পান। কিন্তু সেই টাকার বিনিময়ে তাকে বাড়তি শ্রম এবং সময়ও দিতে হয়। তাই অভিজ্ঞতা, বার্ষিক বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত সময় কাজ থেকে প্রাপ্ত আয় বাদ দিলে শুধুমাত্র স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার মোট মজুরি হিসেবে শ্রমিকরা ৩০,০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করছে।
১২,৫০০০ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা করতে হলে একজন শ্রমিকের মাসিক মজুরি বাড়বে ১৭,৫০০ টাকা। তার মানে ১৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি। এতে একটি পোশাক তৈরির মোট খরচও অনেক বেড়ে যাবে। শ্রমিকের মজুরি ছাড়াও পোশাকের খরচের মধ্যে কাপড়, সুতা, বোতাম, রং, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং আরও বেশ কিছু অন্যান্য ব্যয় রয়েছে। তবে শ্রমিকদের বেতন ১৪০ শতাংশ বাড়লেও কারখানার মোট খরচ ১৪০ শতাংশ বাড়বে না। একটি কাল্পনিক উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝা যাক। ধরা যাক, কোনো কারখানার পোশাক তৈরির মোট খরচ ১০০ টাকা এবং তার মধ্যে সরাসরি শ্রমের খরচ ১০ টাকা। এখন শ্রমের খরচ ১৪০ শতাংশ বাড়লে তা হবে ২৪ টাকা। তাহলে মোট খরচ দাঁড়াবে ১১৪ টাকা। মজুরি ১৪০ শতাংশ বাড়লেও মোট খরচ বাড়ল ১৪ শতাংশ। তবে মোট খরচ অতি সামান্য বাড়লেও কারখানার জন্য তা অনেক বড় চাপ হতে পারে। মনে করুন, ১০০ টাকায় উৎপাদিত পোশাকটি ১০৫ টাকায় বিক্রি করা হতো। তাহলে লাভ হতো ৫ টাকা। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর পর এখন উৎপাদন খরচ ১১৪ টাকা। খরচ বাড়ার পরও যদি পোশাকটি ১০৫ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে পোশাক প্রতি কারখানার লোকসান হবে ৯ টাকা। তাই শ্রমিকদের বেতন বাড়ালে উৎপাদন খরচ সামান্য বাড়ছে বলে মনে হলেও, মোপাদাগে তৈরি পোশাক খাতের ওপর এর প্রভাব অনেক বেশি।
বাংলাদেশে প্রধানত দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান বিদেশি অর্ডারের তৈরি পোশাক সরবরাহ করে। একটি হলো বড় রপ্তানিকারক এবং অন্য ধরনটি হলো ছোট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশের কাছ থেকে কাজ নিয়ে পরবর্তীতে তাদের অর্ডারের কিছু অংশ অন্যান্য ছোট কারখানা থেকে করিয়ে নেয়। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা একরকম নয়। সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানের দরকষাকষির সুযোগ আছে। কিন্তু যেসব ছোট প্রতিষ্ঠান মূল রপ্তানিকারকের কাছ থেকে নির্ধারিত দরে কাজ পায়, তারা শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর ধাক্কা সামলাতে পারবে না। মজুরি বৃদ্ধির পুরো চাপ কারখানার ওপর পড়লে প্রতিষ্ঠানভেদে লোকসান, নিয়োগ কমানো কিংবা কারখানায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় করা মোটেও সহজ বিষয় নয়। সত্যিকার অর্থে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মূলধন হলো সস্তা শ্রম। নামমাত্র মূল্যে বাংলাদেশ থেকে পণ্য উৎপাদন করানো যায় বলেই বিদেশিরা এখান থেকে কাজ করিয়ে নেয়। শুধুমাত্র সস্তা শ্রমের কারণেই বিশ্বের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এই তালিকায় শীর্ষে আছে চীন। ভিয়েতনাম তৃতীয় এবং প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান চতুর্থ। চীন এগিয়ে আছে তাদের উন্নত প্রযুক্তি আর দক্ষতার কারণে। আর বাংলাদেশের বিশেষত্ব হলো সস্তা শ্রম। তাই বাংলাদেশে যদি পণ্য উৎপাদনের অতিরিক্ত খরচ হয়, তাহলে বহু ক্রেতা অন্য দেশে অর্ডার সরিয়ে নিতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন খরচে সামান্য পার্থক্যও বড় অর্ডারের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধরা যাক, প্রতিটি টি-শার্টের উৎপাদন খরচ মাত্র ২ টাকা বেড়ে গেল। তাহলে বিদেশি কোম্পানির ৫ লাখ পিস টি-শার্টের মোট খরচ ১ কোটি টাকা বেড়ে যাবে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে ডলারের হিসেবে প্রায় ৮১,৩০০ ডলার খরচ বাড়বে। এই টাকা যদি তারা অন্য কোনো দেশে কম পায়, তাহলে অবশ্যই বিদেশি কোম্পানি অন্য দেশে অর্ডার দিবে। তবে সবসময় শুধু উৎপাদন খরচ দেখেই অর্ডার আসে না। পোশাক তৈরিতে কাজের মান কেমন এবং ঠিক সময়ে পণ্য পাওয়া যাবে কি না, সেগুলোও বিবেচনা করা হয়। সমস্যা হলো, মজুরি একদিনে বাড়ানো যায়, কিন্তু উৎপাদনের দক্ষতা একদিনে বাড়ে না। নতুন যন্ত্র কেনা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কাজের পদ্ধতি বদলাতে অনেক সময় এবং বিনিয়োগ লাগে। এছাড়া কোনো কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যেতে পারে। সময়মতো পণ্য পাঠানো না গেলে যোগ হয় বাড়তি খরচ। এরকম আরও বহু কারণে বিদেশি অর্ডার হারানোর ভয় আছে। ফলে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দেওয়ার পরও তৈরি পোশাক খাতের নিয়মিত উৎপাদন কিংবা বিদেশ থেকে অর্ডার প্রাপ্তির কোনো নিশ্চিত নেই।
কারখানা মালিকদের দিক বিবেচনায় তৈরি পোশাক খাতের মজুরি বৃদ্ধি মোটেও যৌক্তিক নয়। অন্যদিকে শ্রমিকদের দিক বিবেচনা করলে বর্তমান মজুরি দিয়ে তাদের সংসার চালানোও প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। সুইডেনভিত্তিক বহুজাতিক খুচরা পোশাক বিক্রেতা কোম্পানি এইচঅ্যান্ডএম-এর ২০২৫ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশে মাসিক ন্যূনতম মজুরি প্রায় ১০২ ডলার, ভারতে ১২৪ ডলার, ভিয়েতনামে ১৬৩ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২০৮ ডলার এবং চীনে ২৯৪ ডলার। এই হিসেবে বাংলাদেশের ন্যূনতম মজুরি ভিয়েতনামের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ, কম্বোডিয়ার তুলনায় ৫১ শতাংশ এবং চীনের তুলনায় ৬৫ শতাংশ কম। বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ফেয়ার লেবার অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ শ্রমিকের আয় জীবনধারণযোগ্য মজুরির নিচে। তাই জীবনযাত্রার খরচ বিবেচনায় ৩০,০০০ টাকা মজুরির দাবির পেছনেও শক্ত ভিত্তি আছে। গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের ২০২৫ সালের হিসেবে ঢাকা শহরে একজন শ্রমিকের জীবনধারণের উপযোগী মাসিক মজুরি প্রায় ৩০,৪৫৯ টাকা। ঢাকার আশেপাশের শহর এবং জেলাগুলোতে এই অঙ্ক প্রায় ২৫,১৬৬ টাকা। একটি পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় ধরে এই হিসেব করা হয়েছে। ফলে পোশাক শ্রমিকদের ৩০,০০০ টাকার দাবিকে অযৌক্তিক বলারও কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে আবার মজুরি বাড়ালে কিছু কারখানার অর্ডার হারানোরও ঝুঁকি আছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বেশ ঝুঁকিতেই আছে বলা যায়। ফেয়ার লেবার অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ হলো, বাংলাদেশের উচিত বিদেশি ক্রেতাদের সাথে দরকষাকষি করে পোশাকের মূল্য বাড়ানো। কারণ নৈতিক বিচারে বিদেশি ক্রেতারাও বাড়তি শ্রমবয়ের ন্যাজ্য অংশ বহন করতে বাধ্য। ভিয়েতনামও ২০০৫ সাল থেকে মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের মধ্য দিয়ে গেছে। এরপর ২০১৩ সালে তারা সরকার মালিক এবং শ্রমিক পক্ষ মিলে জাতীয় মজুরি পরিষদ গঠন করে। এর মাধ্যমে তারা নিয়মিত আলোচনা করে শ্রমিকের প্রয়োজন এবং কারখানার সামর্থ্য যাচাই করে নিয়মিত মজুরির সমন্বয় করে আসছে। ২০২৬ সালঞ্চেও দেশটিতে ৭ শতাংশ মজুরি বেড়েছে। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে পথ দেখাতে পারে। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রার উৎস। তাই এই খাতকে ঝুঁকিমুক্ত করতে সরকারের সর্বোচ্চ সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more