প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: নভেম্বর ০৬, ২০২৬, ২:৫০ এ.এম
পবিত্র কাবা শরীফের অজানা ইতিহাস
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান হলো পবিত্র কাবা শরীফ। এটি কেবল একটি ঘর বা স্থাপত্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ইবাদত ও ঐক্যের প্রতীক। মুসলিমরা প্রতিদিন দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের সময় এই ঘরের দিকে মুখ করে (কিবলা) দাঁড়িয়ে থাকেন।
ইসলামিক ইতিহাস ও তাফসিরগ্রন্থ অনুযায়ী, মানবজাতি সৃষ্টির বহু আগে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা পৃথিবীতে প্রথম ইবাদতের ঘর হিসেবে কাবা স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে হজরত আদম (আ.) পৃথিবীতে এসে এই ঘর পুনরায় নির্মাণ ও সংস্কার করেন। সময়ের বিবর্তনে ও নূহ (আ.)-এর আমলের প্লাবনে কাবার মূল অবকাঠামো বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর হুকুমে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) বর্তমান ভিত্তির ওপর কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন। কাবার নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ইব্রাহিম (আ.) মানুষকে এখানে হজ করার জন্য আহ্বান জানানোর নির্দেশপ্রাপ্ত হন। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা এবং শত্রুর আক্রমণের কারণে কাবা শরীফ বিভিন্ন সময়ে পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে। নবী করিম (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে কুরাইশ বংশ কাবা পুনর্নির্মাণ করে। পরবর্তীতে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, উমাইয়া শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এবং অটোমান ও সৌদি আমলেও এর বিভিন্ন সংস্কার কাজ পরিচালিত হয়।
'কাবা' শব্দের আভিধানিক অর্থ ঘনক বা চতুষ্কোণ বিশিষ্ট বস্তু। এর চতুর্ভুজ কাঠামোটি চার কোণ বিশিষ্ট। কাবা ঘরের উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট (১৪ মিটার)। এর পূর্ব দেয়াল প্রায় ৪৮ ফুট ৬ ইঞ্চি, পশ্চিম দেয়াল ৪৬ ফুট ৫ ইঞ্চি, উত্তর দেয়াল (হাতিমের দিক) ৩৩ ফুট এবং দক্ষিণ দেয়াল ৩০ ফুটের মতো দীর্ঘ। কাবার প্রবেশদ্বার বা দরজাটি ভূমি থেকে প্রায় ৭ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। বর্তমান দরজাটি ১৯৭৮ সালে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজের নির্দেশ তৈরি করা হয়, যাতে প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর গুণবাচক নাম খোদাই করা রয়েছে। কাবার পূর্ব কোণে প্রায় ৫ ফুট উঁচুতে রূপার ফেস বা ফ্রেমে বাঁধানো ঐতিহাসিক 'হাজরে আসওয়াদ' বা আসমানি পাথরটি অবস্থিত। এটি তাওয়াফ শুরুর নির্দেশক বা স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাবার উত্তর দিকে একটি অর্ধবৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থান রয়েছে, যাকে 'হাতিম' বলা হয়। এটি মূল কাবার অংশ ছিল, যা পরে সংকীর্ণতার কারণে বাদ দেওয়া হয়েছিল। হাতিমের ভেতরে নামাজ পড়া কাবার ভেতরে পড়ার সমতুল্য গণ্য করা হয়।
কাবা শরীফের ভেতরের মেঝে ও দেয়াল মূল্যবান মার্বেল পাথরে মোড়ানো। এর ছাদকে ধরে রাখার জন্য ভেতরে তিনটি শক্ত কাঠের পিলার রয়েছে। ভেতরের দেয়াল ও ছাদ সুদৃশ্য সবুজ রঙের রেশমি কাপড় বা পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রতি বছর হজ মৌসুমের প্রাক্কালে কাবার কালো রঙের রেশমি গিলাফ বা 'কিসওয়া' পরিবর্তন করা হয়। এই গিলাফে সোনা ও রূপার সুতা দিয়ে সুনিপুণভাবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও কালেমা খোদাই করা থাকে। মক্কা বিজয়ের পর থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবার চাবি বনি শায়বাহ গোত্রের ওসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর পরিবারের কাছে অর্পণ করেছিলেন। বংশপরম্পরায় আজও এই পরিবারের উত্তরসূরিরাই কাবা ঘরের চাবি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পবিত্র কাবা শরীফ বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের মূর্ত প্রতীক এবং আল্লাহর ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দু, যা যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে শান্তি, সাম্য ও তৌহিদের শিক্ষা দিয়ে আসছে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more