প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২১, ২০২৬, ৭:০১ এ.এম
একজন নিশংস সিরিয়াল কিলারের গল্প
অ-অ+
বিশেষ ডকুমেন্টারি: খুলনার কুখ্যাত ডন এরশাদ শিকদারের জন্ম ১৯৫৪ সালের দিকে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার বাবার নাম ছিল বন্দে আলী শিকদার। ভাগ্য অন্বেষণে ১৯৬৬ বা ১৯৬৭ সালের দিকে এরশাদ শিকদার তার নিজ গ্রাম ছেড়ে খুলনায় চলে আসে। খুলনায় এসে প্রথম দিকে সে রেলস্টেশনে কুলি বা পোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করে। অপরাধ জগতে প্রবেশ ও "রাঙ্গা চোর": স্টেশনে কুলিগিরি করার পাশাপাশি এরশাদ ছোটখাটো চুরি ও পকেটমারি শুরু করে। এই সময়ে চুরি করা জিনিসপত্রসহ সে ধরা পড়েছিল এবং স্থানীয়ভাবে তাকে সবাই "রাঙ্গা চোর" বা "রাঙ্গা চোরা" নামে ডাকতে শুরু করে। কিন্তু সাধারণ চোর থেকে সে দ্রুতই একজন হিংস্র অপরাধীতে রূপ নেয়। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে সে নিজস্ব একটি গ্যাং তৈরি করে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল 'রামদা বাহিনী'। এই বাহিনীর জোরে সে খুলনার ৪ নম্বর ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকার রেলওয়ে ডক এবং নদীঘাটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়। ঘাট এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, ডাকাতি ও তেলের চোরাচালান ছিল তার আয়ের মূল উৎস। রাজনৈতিক আশ্রয় ও ক্ষমতার শিখর: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের চোখ এড়াতে এরশাদ শিকদার সুকৌশলে রাজনীতির আশ্রয় নেয়। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে, এরশাদ নিজেকে সেই দলের সাথে জড়িয়ে নিয়েছে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসক এরশাদ শিকদারের আমলে সে 'জাতীয় পার্টি'তে যোগ দেয় এবং ১৯৮৮ সালে খুলনার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার (বর্তমান কাউন্সিলর) নির্বাচিত হয়। এরপর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে দল পরিবর্তন করে বিএনপিতে যোগ দেয় এবং নিজের ক্ষমতা ধরে রাখে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সে পুনরায় দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। এই রাজনৈতিক ছত্রছায়াই তাকে দীর্ঘ দুই দশক ধরে আইন ও বিচার ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে রেখেছিল। স্বর্ণকমল ও টর্চার সেল: অপরাধ সাম্রাজ্য থেকে উপার্জিত বিপুল অর্থ দিয়ে এরশাদ শিকদার খুলনায় একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ গড়ে তোলে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল "স্বর্ণকমল"। এই বাড়িটি ছিল অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত। তবে এই জাঁকজমকের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল তার চরম নৃশংসতা। ১৯৯১ সালে সে খুলনার ৪ নম্বর ঘাটের কাছে জনৈক রফিকের একটি বরফ কল জোরপূর্বক দখল করে নেয়। এই বরফ কলটিকে সে তার ব্যক্তিগত টর্চার সেল বা নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করে। তার কথার অবাধ্য হওয়া বা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানো ব্যক্তিদের এই বরফ কলে এনে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হতো। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, মানুষকে হত্যা করার পর সে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পেত এবং কখনো কখনো দুধ দিয়ে গোসল করত। নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও পতন: এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে ৬০টিরও বেশি মানুষকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তার নৃশংসতার শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ প্রায়ই নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো কিংবা ইট বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। তবে তার পতনের সূত্রপাত হয় ১৯৯৯ সালের মে মাসে, যখন সে রাজনৈতিক কর্মী খালিদ হোসেনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর খুলনার সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বডিগার্ড ও সহযোগী নূরে আলম পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হয়। নূরে আলম আদালতে দাঁড়িয়ে এরশাদ শিকদারের করা ২৪টি রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেয়, যা এরশাদ শিকদারের অপরাধ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেয়। গ্রেপ্তার, বিচার ও ফাঁসি: গণ-অসন্তোষ এবং বিশ্বস্ত সহযোগীর জবানবন্দির পর ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরশাদ শিকদারকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ মোট ৪৩টি মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ৭টি হত্যা মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪টি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে করা তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হওয়ার পর, ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এই কুখ্যাত জল্লাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার ও নৃশংস এক অপরাধ অধ্যায়ের।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more