সাইনবোর্ডের আগুনে পুড়ল ভৈরবে দুই গ্রামের সম্প্রীতি
Date: 2026-07-29
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ২৯, ২০২৬, ৩:২৬ এ.এম
সাইনবোর্ডের আগুনে পুড়ল ভৈরবে দুই গ্রামের সম্প্রীতি
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
একটি সাইনবোর্ড ঘিরে দুই গ্রামের রক্তের হোলি খেলেছে মানুষ, যার জেরে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক, আত্মীয়তা ও পারস্পরিক বিশ্বাস ভেস্তে গিয়ে তৈরি হয়েছে চরম শত্রুতা। কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবরনগর ও মিরারচর—এই দুই গ্রামের মধ্যে ২০২৩ সাল থেকে চলমান এই সংঘাত সম্প্রতি আবারও নতুন করে রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। এতে মিরারচর গ্রামের মাসুদ ও হিরণ নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন এবং অন্তত ২৫ জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও রেলপথে কয়েক ঘণ্টা ট্রেন ও যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে।
স্থানীয় প্রবীণদের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। পরে ১৯৯১ সালে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের যৌথ উদ্যোগে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা এত দিন স্থানীয়ভাবে ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। ২০০টির বেশি দোকান নিয়ে পরিচালিত এই বাজারের পরিচালনা কমিটিতেও ছিল ভারসাম্য—সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ পদ আকবরনগরের এবং সাধারণ সম্পাদক পদ মিরারচরের প্রতিনিধি পেয়ে আসছিলেন। তবে বিপত্তির সূচনা হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, যখন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সড়ক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সেখানে একটি সাইনবোর্ড বসায়। সাইনবোর্ডে শুধু 'আকবরনগর বাজার' লেখা থাকায় মিরারচরের বাসিন্দারা তা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তাঁদের মতে, যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত বাজারে একক গ্রামের নাম দেওয়া ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার শামিল। অন্যদিকে, আকবরনগরবাসীর দাবি—বাজারটি আকবরনগর মৌজায় ও তাঁদের মালিকানাধীন জমিতে অবস্থিত এবং এর তিন দিকই তাঁদের গ্রাম দিয়ে ঘেরা, তাই এই নামে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রথম সংঘর্ষের পর সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ফাটল রয়েই যায়। চলতি বছরের ১৯ জুলাই বাজারে এক রিকশাচালকের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সামান্য বাগ্বিতণ্ডা হয়। এই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরোনো ক্ষোভ নতুন করে জ্বলে ওঠে এবং সাইনবোর্ড পরিবর্তনের দাবি সামনে এনে উভয় পক্ষ আবারও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সংঘর্ষের ফলে বাজার এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাভাবিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কেনাকাটা ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও এখন গ্রামভিত্তিক বিভাজন তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকাটিতে কড়া নজরদারিতে রয়েছে। ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশিদ জানান, শান্তি বজায় রাখতে একাধিকবার উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। তবে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, সওজ কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, আকবরনগর মৌজা ও বাসস্ট্যান্ডের নাম অনুসরণ করেই সাইনবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছিল। তবে একটি সাইনবোর্ড কেন্দ্র করে যদি আইনশৃঙ্খলা ও জনশান্তি বিঘ্নিত হয়, তবে জনস্বার্থে তা পরিবর্তন বা অপসারণের উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more