স্মার্টফোনে ভাঙছে সম্পর্ক: নষ্ট হচ্ছে আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি

Date: 2025-12-23
news-banner

বিডিফেস ডেক্স:

নিয়ন্ত্রণহীন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে আর্থিক অপচয় ও সামাজিক অবক্ষয়। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসায় প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে। তবে অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে এই প্রযুক্তিই সমাজে তৈরি করছে এক নীরব সংকট। স্মার্টফোন আসক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন, বাড়ছে আর্থিক অপচয় এবং সামাজিক অবক্ষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা ও নীতিগত উদ্যোগ না নিলে এই নীরব সংকট আরও গভীর হবে।

দুই হাতে দুই মোবাইল, সম্পর্ক হচ্ছে ফাঁপা-

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে মোবাইল সিম সংযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৮০ লাখে। ফলে একজনের একাধিক সিম ব্যবহার এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে কলরেট ও ইন্টারনেট প্যাকেজে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবহার না হওয়া মিনিট ও ডাটা অপারেটরদের কাছেই থেকে যাচ্ছে। এতে ভোক্তারা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেও এ বিষয়ে কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

একাধিক সিম ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের জীবনেও বিপর্যয়-

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘন ঘন সিম পরিবর্তন ও একাধিক সিম ব্যবহারের কারণে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মিস করছেন। এতে চাকরি, ভর্তি, পরীক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সুযোগ হারাচ্ছেন অনেকে।

বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে, যা তাদের পড়াশোনা, মানসিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দাম্পত্য সম্পর্কে বাড়ছে দূরত্ব-

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মার্টফোন আসক্তির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ছে দাম্পত্য জীবনে। কর্মব্যস্ত দিনের শেষে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সময় কাটছে আলাদা আলাদা স্ক্রিনে চোখ রেখে।

ফলে কমছে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বাড়ছে মানসিক দূরত্ব। অনেক ক্ষেত্রে এই আসক্তি দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ এমনকি পারিবারিক ভাঙনের কারণ হয়ে উঠছে।

সামাজিক বন্ধনে ফাটল-

একসময় সামাজিক অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হয়ে কুশল বিনিময় ছিল সংস্কৃতির অংশ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, রিলস ও পোস্ট। এর ফলে সামাজিক আন্তরিকতা কমছে, দুর্বল হচ্ছে মানবিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহমর্মিতা।

স্বাস্থ্যের ওপর নীরব আঘাত-

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারে চোখে জ্বালা, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা ও ঘুমের সমস্যা বাড়ছে। মোবাইল ফোনের ব্লু লাইট ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় ‘মেলাটোনিন’ হরমোনের নিঃসরণ ব্যাহত করে।

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে বাড়ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও একাকিত্ব। পাশাপাশি ‘ফাবিং’—প্রিয়জনকে উপেক্ষা করে ফোনে মগ্ন থাকার প্রবণতা—পারিবারিক সম্পর্ককে আরও দুর্বল করছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিতেও ভারসাম্যের গুরুত্ব-

ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে ঘুমকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আর-রূম: ২৩) এবং দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা ও প্রশান্তির কথা বলা হয়েছে (সূরা আর-রূম: ২১)।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবারকে যথাযথ সময় ও গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ স্মার্টফোন আসক্তি সেই ভারসাম্য ব্যাহত করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর লাগামহীন ব্যবহার। স্মার্টফোন ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক ও সামাজিক সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন এবং ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


বিডিফেস/এম ডিউক

Leave Your Comments