সৌদি-মার্কিন বন্ধুত্বের সমীকরণ: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তে লেখা ইতিহাস
Date: 2026-07-30
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ৩০, ২০২৬, ১২:০৪ পি.এম
সৌদি-মার্কিন বন্ধুত্বের সমীকরণ: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তে লেখা ইতিহাস
অ-অ+
বিডিফেস ২৪ এর বিশেষ আয়োজন:
১.৪ ট্রিলিয়ন। সংখ্যাটা আসলে ঠিক কত বড়? ধারণা করতে পারেন কি? আপনার হিসেবের সুবিধা করে দিচ্ছি দাঁড়ান। ১০ লক্ষে হয় ১ মিলিয়ন। ১ হাজার মিলিয়নে ১ বিলিয়ন। আর ১ হাজার বিলিয়নে হয় ১ ট্রিলিয়ন। কী বিশাল না সংখ্যাটা? হ্যাঁ, ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এই সুবিশাল সংখ্যাটা সৌদি রাজপরিবারের মোট সম্পদের আনুমানিক পরিমাণ। আনুমানিক বলছি কারণ, তারা কাউকেই তাদের সম্পদের হিসাব দিতে বাধ্য নয়। তবে বিভিন্ন সূত্র মতে, তাদের সম্পদের পরিমাণ এমনই। টাকার হিসেবে এ পরিমাণটা দাঁড়ায় দেড় লক্ষ বিলিয়নের কাছাকাছি, যা দিয়ে বানানো যাবে প্রায় ৪শ' পদ্মা সেতু।
এ দুনিয়ার সবচাইতে ধনী বলা হয় এলন মাস্ককে। তার সম্পদের পরিমাণ কত জানেন? ২১৭ বিলিয়ন ডলার। মানে বুঝতে পারছেন? এলন মাস্কের মতো ৭ জনকে কিনে ফেলার সামর্থ্য রয়েছে সৌদি রাজপরিবারের। কিন্তু তাহলে তাদের নাম বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় নেই কেন? ওই যে বললাম, তাদের সম্পদের সঠিক হিসেব পাওয়া যায় না। তবে নিশ্চিত থাকুন, গোটা মুল্লুকে সৌদি রাজপরিবারের সম্পদের ধারেকাছেও কোনো সম্পদ নেই। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পদের পরিমাণ কত জানেন? মাত্র ৮৮ বিলিয়ন ডলার। বলা যায়, সম্পদের দিক দিয়ে সৌদি রাজপরিবারের কাছে নেহাত চুনোপুটি তারা।
অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, মেক্সিকো কিংবা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলোর জিডিপির চেয়েও সৌদি রাজপরিবারের সম্পদ বেশি। তবে আজ থেকে ১০০ বছর আগেও কিন্তু তাদের এত শানশওকত ছিল না। এই অর্ধেকের সম্পদের অজানা গল্পই বিডিফেস ২৪ এর আজকের আয়োজনের মূল বিষয়বস্তু।
বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন আধুনিক দুনিয়ার সুপারপাওয়ার হবার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু সুপারপাওয়ার তো আর চাইলেই হওয়া যায় না। এক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান শর্ত খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যতা। তাও অবশ্য নেহাত কম নেই আব্রাহাম লিংকনের উত্তরসূরিদের। কিন্তু এসব খনিজ সম্পদ তো লিমিটেড। শেষ হয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। আর শুধুমাত্র নিজেদের খনিজ উৎসের উপর ভরসা করেই বসে থাকার মতো কাজ মার্কিন প্রশাসন কবেই বা করেছে?
এরই মধ্যে ১৯৩৮ সালে সৌদি আরবের ধু ধু মরুর তলদেশে দেখা মিলল খনিজ তেলের সুবিশাল ভান্ডারে। যত প্রকার খনিজ রয়েছে, তার মধ্যে তেল আর গ্যাসই কিন্তু সবচেয়ে কিছুদিন আগে আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় তা হারে হারে টের পেয়েছেন নিশ্চয়ই। তো যা বলছিলাম, রিসার্চ করে দেখা গেল সৌদি আরব যেন তেলের উপরই ভেসে আছে। এটা একদিকে যেমন আনন্দের সংবাদ, অন্যদিকে কিন্তু ভয়েরও কারণ। কে কখন তেলের জন্য আরব মুল্লুকে হামলা করে, তা তো বলা যায় না।
এই ঝুঁকি এড়াতে সৌদি রাজপরিবার চাইলেও বাড়তি নিরাপত্তা। এলাকার মোড়লকে যদি হাত করে ফেলা যায়, তাহলে আমার দিকে আঙুল তোলার সাহস কার? এই চিন্তা থেকেই সৌদি রাজপরিবার শক্তিশালী মার্কিন প্রশাসনকে প্রস্তাব পাঠালো একটা চুক্তিতে আসতে। আরবের আমেরিকার যৌথ মালিকানায় গড়ে উঠল এক সুবিশাল এন্টারপ্রাইজ। নাম আরামকো। এই আরামকোর তত্ত্বাবধানে শুরু হলো তেল উত্তোলন। সেই থেকে শুরু হলো সৌদি রাজপরিবারের টাকার খেলা।
১৯৪৫ সাল। অর্ধেক দুনিয়া তখন জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে।
এই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রচুর তেলের দরকার হচ্ছিল আমেরিকার। সে প্রয়োজন মেটাতে তৎকালীন সৌদি কিং আবদুল আজিজের সাথে চুক্তি করে তারা। তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা। আমেরিকা যত তেল চাইবে, সৌদি আরব তত তেল বেচবে তাদের কাছে। বিনিময়ে সৌদির সামরিক নিরাপত্তার দিকটা দেখবে মার্কিন সরকার। বেশ ভালোই চলছিল সবকিছু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন সরকারের গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে ঘোড়ানো আরব বাড়লো। সেই সাথে বাড়তে লাগল তাদের মিত্র সৌদি রাজপরিবারের সম্পদের পরিমাণ।
ঝামেলাটা বাধল ১৯৭৩ এ গিয়ে। আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে বসল আমেরিকা। গোটা মধ্যপ্রাচ্য ক্ষোভে ফেটে পড়ল আমেরিকার বিরুদ্ধে। আরব দেশগুলোর তেলভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওপেক মার্কিনদের শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নিল। সেই মোতাবেক সৌদি কিং আরামকোর মাধ্যমে তেল উত্তোলন বন্ধ করে দিলেন। মহাবিপদে পড়ল আমেরিকা। তেল নিয়ে টানাটানি বেঁধে গেল। কোথাও তেল মিলছে না। মিললেও তার দাম আকাশছোঁয়া।
আবার মুখোমুখি বসল মার্কিন আর সৌদি প্রশাসক। এবার আমেরিকার প্রস্তাব, তোমাদের কি চাই বলো? অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ, রাজনৈতিক সাপোর্ট—যা চাও সবই দিচ্ছি। বিনিময়ে আমাদের শুধু একটা শর্ত মেনে নাও। তেল শুধুমাত্র ডলারেই বেচাকেনা হবে, অন্য কোনো মুদ্রায় নয়। মন গলল সৌদি কিংয়ের। সেই থেকে বিশ্ব তেল বেচাকেনার মাধ্যম হয়ে উঠল ডলার। এখনো তা চলমান। আর ডলার ছাপায় কারা? নিশ্চয়ই আমেরিকা।
আশির দশকে সৌদি রাজপরিবার আরামকোকে পুরোপুরি কিনে নেয়। নতুন নাম দেওয়া হয় সৌদি আরামকো। আরামকো পুরোপুরি সৌদি রাজপরিবারের মালিকানায় চলে যাওয়ায় গোটা দেশের তেলের খনির মূল মালিক বনে যায় তারা। তেলের বিজনেসের চাইতে মালদার বিজনেস আর আছে কয়টা? আর সেই বিজনেসে একচেটিয়া লালে লাল হতে সময় লাগে? কারিগরি টাকার সাথে সাথে নিত্যনতুন ঝামেলাও আসতে লাগল সামনে।
আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের সাথে সৌদি রাজপরিবারের সখ্যতা ছিল বহুদিন ধরে। সৌদির এক বড় কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মালিক ছিল বিন লাদেনের পরিবার। আরবের বিভিন্ন বড় বড় স্থাপনা তৈরি করেছে এই কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। সৌদি রাজপরিবারের আদেশে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াইয়ে অংশও নিয়েছিলেন লাদেন।
কিন্তু এক পর্যায়ে লাদেন বুঝতে পারেন, ইসলামের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আর শাশ্বত দেশটিকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে নিজেদের আখের গোছাতে। এটা তিনি মেনে নিতে পারলেন না কোনোভাবেই। চাইলেন মার্কিনিদের হটাতে। কিন্তু মার্কিনিদের হটালে সৌদি রাজপরিবারের ভুরি ভুরি ডলার কামানোর রাস্তা যে বন্ধ হয়ে যাবে, তা তো হয় না। আবার লাদেনকে চটালে এত বড় কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সুবিধা হাতছাড়া হয়ে যায়।
কাজেই দুই দিকেই তাল দিয়ে চলার চেষ্টা করল সৌদি রাজপরিবার। কিন্তু কাজ হলো না। চোটলেন লাদেন। এরপর আমেরিকার সাথে আল-কায়েদার হাঙ্গামার বিষয় তো আমাদের সবারই জানা।
মার্কিন-সৌদি সম্পর্ক পরবর্তীতে মোড় নেয় নাইন ইলেভেনের হামলার পর। আমেরিকার ভাষ্যমতে, হামলায় জড়িত ১৯ জনের মধ্যে ১৫ জনই ছিল সৌদি নাগরিক। তবে সৌদি সরকার তা অস্বীকার করে। অস্বীকার না করেও বা উপায় কি? আরবের জনসাধারণ এমনিতেই তাদের উপর চটা। এই অবস্থায় নির্দেশের জনগণের পক্ষ না নিলে তো বিপদ। কিন্তু দীর্ঘদিনের বন্ধু আমেরিকা যে তাতে অখুশি হলো। আবারও দুই নৌকায় পা দিল সৌদি প্রশাসন। আমেরিকার যেকোনো অন্যায়-অবিচারে টু শব্দটিও করা বাদ দিল তারা।
খেয়াল করে দেখুন, গোটা মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু যে দেশী, সেই দেশ ইরাক-সিরিয়া সহ বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে কখনোই মাথা ঘামায় না। কারণটা কি ধরতে পারছেন? এখানেই শেষ নয়। বিশ্বের সবচাইতে বেশি অস্ত্র ক্রয়কারী দেশ সৌদি আরব। আরে এত এত টাকা খরচ তো একভাবে করা লাগবে নাকি? তো এসব অস্ত্রের সিংহভাগই কেনা হয় আমেরিকার কাছ থেকে। শুধুমাত্র ২০২০ সালে সামরিক খাতে ৪৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করেছে সৌদি প্রশাসন, যার ৮৮ শতাংশই গিয়েছে আমেরিকার পকেটে।
তবে সামরিক খাতে সৌদি আরব অনেক আগেই থেকেই আমেরিকার বাধা খোত দেন। নাইন ইলেভেনের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিল আমেরিকা সৌদি আরবের কাছে আর অস্ত্র বেচবে না। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। এমন ক্ষোদদের কি কেউ হাতছাড়া করতে চায়? সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মোড়লগিরি ধরে রাখতে সৌদি প্রশাসনকেই তো তাদের দরকার।
মজার ব্যাপার কি ঘটেছে দেখুন। সৌদি আরবের কাছে এত বিপুল অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে মার্কিন সরকার প্রকারান্তরে সেই সব যোদ্ধাদের হাতেই অস্ত্র তুলে দিচ্ছে, যাদেরকেই তারা বলছে টেররিস্ট। আবার তাদের বিরুদ্ধে নিজেদের সেনাপ্রধানও যুদ্ধ করছে। মার্কিন চাল বোঝা বড় দায়।
সৌদি রাজপরিবারের ধনসম্পদের নমুনা বুঝতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দিকে তাকান। ৪৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির একটা পেইন্টিং কিনেছেন তিনি। জি, ভুল কিছুই শোনেননি। একটা ছবির দাম ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ফ্রান্সে ৩০০ মিলিয়ন ডলারে কেনা এক প্রাসাদ রয়েছে তার, যা এককালে ছিল বিশ্বের সবচাইতে দামি বাড়ি।
অর্থ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এক বিলাসবহুল প্রমোদতরী বানিয়েছেন তিনি। এভাবে কত জায়গায় কত বিলিয়ন যে তিনি ঢেলেছেন, তার হিসাব হয়তো তিনি নিজেই জানেন না। তার এসব বিলাসিতা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর কি ছিল জানেন? আমি একজন ধনী লোক, গরিব নই। আমি গান্ধী বা ম্যান্ডেলাও নই। কী বুঝলেন? টাকার গরম যে কি জিনিস, তা বোঝার জন্য যুবরাজের এই এক উক্তি যথেষ্ট নয় কি?
বুঝতে পারছেন আমেরিকা দাওয়াটা কোন খানে মেরেছে? পেট্রোডলার টার্মটা শুনেছেন না? শুরুটা কিন্তু এখান থেকেই।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more