বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২): ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ
Date: 2026-10-02
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০২, ২০২৬, ৩:৫৯ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২): ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ:
(যুদ্ধ, সাম্রাজ্য ও ভূ-রাজনীতি: বিশ্ব শাসনের ইতিহাস)
বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই যেখানে সামান্য একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বেসরকারি কর্পোরেশন একটি আস্ত উপমহাদেশকে দীর্ঘ দিন ধরে শাসন করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের স্বার্থে পুনর্গঠন করেছে। ষোড়শ শতাব্দীতে উসমানীয় সাম্রাজ্যের কারণে ইউরোপীয়দের প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ ও চড়া শুল্কের মুখে পড়লে তারা বিকল্প বাণিজ্যের জলপথ খুঁজছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের কাছ থেকে রাজকীয় সনদ বা 'রয়্যাল চার্টার' নিয়ে গঠিত হয় দ্য গভর্নর অ্যান্ড কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব লন্ডন ট্রেডিং ইনটু দ্য ইস্ট ইন্ডিজ—যা বিশ্ব ইতিহাসে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ নামে পরিচিত। প্রাথমিকভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মূল্যবান মসলা, রেশম, সুতি বস্ত্র ও চায়ের বাণিজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে ভারতে আগমন করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এই কোম্পানিটি বাণিজ্যের খোলস ছাড়িয়ে সামরিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতে মোঘল সাম্রাজ্য যখন শক্তির চরম শিখরে ছিল, তখন উসমানীয় ও ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকতে কোম্পানিটি সুরাট, মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতায় নিজেদের কুঠি স্থাপন করে। তবে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মোঘল কেন্দ্রবিন্দু দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথেই আঞ্চলিক সুবাদার ও রাজাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দলকে কাজে লাগাতে শুরু করে তারা। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তর সামরিক শক্তির চেয়ে কৌশলগত ষড়যন্ত্র ও ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং পরবর্তীতে ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল একজন ব্যবসায়ী থেকে ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রকে উন্নীত হয়। ১৭৬৫ সালে মোঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার 'দেওয়ানি' বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার পাওয়ার পর এই বাণিজ্য গোষ্ঠীটি কার্যত এক বিশাল অঞ্চলের অপ্রতিরোধ্য সরকারে পরিণত হয়।
দেওয়ানি লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও কাঁচামাল ইংল্যান্ডে পাচার হতে শুরু করে, যাকে ইতিহাসবিদরা 'ড্রেন অব ওয়েলথ' বা সম্পদ পাচার হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতীয় তাঁতশিল্পকে ধ্বংস করে এবং বাংলার লাখ লাখ একর উর্বর কৃষিজমিতে খাদ্যশস্যের বদলে জোরপূর্বক নীল ও আফিম চাষ করিয়ে বিপুল মুনাফা লুট করে কোম্পানিটি। চীনের সাথে বাণিজ্যিক ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে আনতে তারা বাংলা থেকে আফিম তৈরি করে বেআইনিভাবে চীনে রফতানি করতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঐতিহাসিক 'আফিম যুদ্ধ' বা অপিয়াম ওয়ারের জন্ম দেয়। অন্যদিকে, বাংলা ও ভারত থেকে সংগৃহীত বিপুল রাজস্ব ও কাঁচামাল ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবকে অভূতপূর্ব গতি প্রদান করে। এভাবে একটি উপনিবেশের অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্য নিজেকে সমগ্র বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক ও শিল্প পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করে।
একবিংশ শতাব্দীর বহু-জাতীয় কর্পোরেশনগুলোর মতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল নিজস্ব ব্যবসা চালাত না, বরং তাদের ছিল নিজস্ব এক বিশাল সেনাবাহিনী যা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নিয়মিত বাহিনীর চেয়েও আকারে দ্বিগুণ বড় ছিল। নিজেদের এই ভাড়াটে 'সিপাহি' বাহিনী ও সর্বাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোম্পানিটি ফরাসি ও ওলন্দাজ প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভারত থেকে বিতাড়িত করে এবং একের পর এক রাজ্য গ্রাস করে সমগ্র উপমহাদেশে নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তবে কোম্পানির চরম শোষণ, সাংস্কৃতিক অবমাননা ও ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসনের ফলে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত হয় মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিপ্লব। এই রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ কোম্পানি শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয় এবং লন্ডনের শাসকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
সিপাহি বিপ্লব দমনের পরপরই ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট 'ভারত শাসন আইন' পাস করে। এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলুপ্তি ঘটানো হয় এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদ বা 'ব্রিটিশ ক্রাউন'-এর হাতে হস্তান্তরিত হয়। সূচনা হয় ব্রিটিশ রাজ বা সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এক দীর্ঘ ও শোষণের অধ্যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুরু করা সেই ঔপনিবেশিক প্রভাব পরবর্তীতে আফ্রিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও সুদূর প্রাচ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, যা বিশ্ব মানচিত্রে একের পর এক নতুন সীমান্ত ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জন্ম দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস কেবল এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্ব জয়ের গল্প নয়; বরং কীভাবে কর্পোরেট ক্ষমতা, অর্থনৈতিক শোষণ ও সামরিক শক্তি একত্রিত হয়ে একটি ভূখণ্ড ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে পঙ্গু করে রাখতে পারে, এটি তার এক রোমাঞ্চকর ও বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক দলিল।
(আগামীকাল পর্ব ৩-এ থাকছে: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও সাইকস-পিকো চুক্তি)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more