বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৩): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার যুদ্ধ : প্রযুক্তির নতুন সাম্রাজ্যবাদ
অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ৪:৫২ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ৪:৫২ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ২৩): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার যুদ্ধ : প্রযুক্তির নতুন সাম্রাজ্যবাদ
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
মানব ইতিহাসের প্রতিটি যুগে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু শক্তির উপাদানের ওপর ভিত্তি করে—কখনো তা ছিল ভূখণ্ড ও বিশাল সেনাবাহিনী, কখনো শিল্প বিপ্লবের অর্থনৈতিক শক্তি, আবার কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। তবে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝপথে দাঁড়িয়ে বিশ্বরাজনীতি এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক মোড়ের মুখোমুখি। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ক্ষমতার নতুন মুদ্রা বা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence - AI), সাইবার সক্ষমতা এবং বিশ্বব্যাপী বিপুল ডেটা বা তথ্যের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এই প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তারকেই এখন গবেষক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আখ্যায়িত করছেন ‘প্রযুক্তির নতুন সাম্রাজ্যবাদ’ (Digital Neo-Imperialism) হিসেবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ কেবল শিল্পকারখানা বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সহায়কমাত্র নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে। এআই-চালিত স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র ব্যবস্থা (Autonomous Weapons Systems), নিখুঁত সামরিক ড্রোন বহর, যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অ্যালগরিদম এবং ভবিষ্যদ্বাণীমূলক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বিশ্বজুড়ে সামরিক যুদ্ধের পুরোনো সমীকরণগুলোকে রাতারাতি বদলে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও বেইজিং—উভয় পরাশক্তিই ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, যে রাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে, আগামী দিনের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার চাবিকাঠি কার্যত তাদের হাতেই থাকবে। আর এই কারণেই এআই চালনার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘সেমিকন্ডাক্টর মাইক্রোচিপ’ (Semiconductor Microchips)-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং তাদের মিত্রদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক তীব্র প্রচ্ছন্ন যুদ্ধ। তাইওয়ান ও পূর্ব এশিয়ার চিপ উৎপাদক কেন্দ্রগুলো আজ বিশ্বরাজনীতিতে সবচেয়ে সংবেদনশীল কৌশলগত বিন্দুতে রূপ নিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি 'সাইবার যুদ্ধ' (Cyber Warfare) এখন রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শনের এক কার্যকর ও অদৃশ্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রথাগত যুদ্ধে একটি গোলা না ফাটিয়ে কিংবা ভৌগোলিক সীমান্তে সৈন্য না পাঠিয়েও আজ শত্রুপক্ষের জাতীয় পরিকাঠামো সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়া সম্ভব। প্রতিপক্ষের বৈদ্যুতিক গ্রিড ধসিয়ে দেওয়া, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ করা, পারমাণবিক স্থাপনায় ডিজিটাল সংক্রমণ ঘটানো কিংবা জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন নিয়মিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় সাইবার কমান্ডকে আধুনিক সামরিক বাহিনীর সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। সাইবার হামলা আজ কোনো দূরবর্তী হুমকি নয়, বরং পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ছায়া যুদ্ধ বা ‘গ্রে-জোন ওয়ারফেয়ার’-এর সবচেয়ে সক্রিয় অস্ত্র।
অন্যদিকে, 'তথ্যের ভূ-রাজনীতি' (Geopolitics of Data) বিশ্বজনমত ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের এক ভয়াবহ মাধ্যম হিসেবে দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বৈশ্বিক সার্চ ইঞ্জিন এবং এআই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক তথ্যকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করা, শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য (Disinformation) ছড়ানো এবং কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণকে চরম রূপ দেওয়া আজ অতি সহজ হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চীনা প্ল্যাটফর্ম 'টিকটক' নিষিদ্ধের প্রচেষ্টা কিংবা চীন কর্তৃক পশ্চিমা সার্চ ইঞ্জিন ও প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা কেবল বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা নয়—এটি মূলত নাগরিক তথ্য সুরক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই।
প্রযুক্তির এই দ্রুত বিকাশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি হলো ‘প্রযুক্তিগত ব্লকিফিকেশন’ বা ডিজিটাল মেরুকরণ। বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি এখন দুই প্রধান প্রযুক্তি অক্ষের অধীনে বিভক্ত হয়ে পড়ছে—একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ডিজিটাল ইকোসিস্টেম, আর অন্যদিকে চীনের নিজস্ব এআই, ৫জি/৬জি নেটওয়ার্ক এবং ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার। উন্নয়নশীল ও উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো এই প্রযুক্তিগত লড়াইয়ের মধ্যে এক ধরনের ডিজিটাল উপনিবেশবাদের শিকার হচ্ছে। যাদের নিজস্ব ডেটা সেন্টার, সার্ভার ও উচ্চমানের অ্যালগরিদম তৈরির সক্ষমতা নেই, তারা সরাসরি এই দুই পরাশক্তির যেকোনো একটির ওপর প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ নির্ভশীল হয়ে পড়ছে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে তাই স্পষ্ট বার্তা—যে জাতি ডেটা, অ্যালগরিদম ও ডিজিটাল অবকাঠামো শাসন করবে, তারাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বিশ্ব শাসনের আসল ইতিহাস।
(আগামীকাল ২৪শে অক্টোবর, চব্বিশতম পর্বে থাকছে: জলবায়ু ভূ-রাজনীতি ও এনার্জি ট্রানজিশন: গ্রিন এনার্জি ও রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসের দখল লড়াই)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more