ইসলামী স্বর্ণযুগ: আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি ও মুসলিম মনীষীদের অবদান
অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ৫:০৫ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ৫:০৫ এ.এম
ইসলামী স্বর্ণযুগ: আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি ও মুসলিম মনীষীদের অবদান
অ-অ+
নিজস্ব প্রতিবেদক:
অষ্টম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিমদের হাত ধরে বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সময়কে ইসলামী স্বর্ণযুগ বলা হয়। সে সময়ে মুসলমানদের দ্বারা নতুন নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা উদ্ভাবিত না হলে আজকের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। পদার্থ, রসায়ন, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, স্থাপত্য, মনস্তত্ত্ব থেকে শুরু করে সাহিত্য, শিল্পকলা বা দর্শন, জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে মুসলিম মনীষীরা অবদান রাখেননি। আজকের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং কম্পিউটার ভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি মুসলিম বিজ্ঞানীদের গবেষণার উপর সরাসরি নির্ভরশীল। বিডিফেসের আজকের আয়োজনে ইসলামী স্বর্ণযুগ সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গায় জ্ঞান অর্জনের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সময়ের মুসলিম গবেষক ও বিজ্ঞানীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই জ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় অনুসন্ধান চালিয়েছেন। পশ্চিমারা বলে পঞ্চম শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় ১০০০ বছর পৃথিবীর ইতিহাসে এক অন্ধকার যুগ। এরপর ইউরোপীয় রেনেসার মাধ্যমে পৃথিবী আবার উন্নয়নের শিখরে পৌঁছায়। প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগে মুসলিমরা যে জ্ঞানের চর্চা করেছিল তার ভিত্তিতেই পরবর্তী যুগে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছে। ইউরোপ মহাদেশ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যে চলছে বিজ্ঞান চর্চার স্বর্ণযুগ।
ইসলামী স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র ছিল বায়তুল হিকমা বা হাউজ অব উইজডম। অষ্টম শতাব্দীতে আব্বাসী খিলাফতের সময় খলিফা হারুনুর রশিদ ইরাকের বাগদাদে এই জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই লাইব্রেরিতে অসংখ্য পন্ডিত গবেষণা করেছেন। বায়তুল হিকমা কোনো সাধারণ লাইব্রেরি ছিল না, এখানে গ্রীক, পারস্য, ভারতীয়, চীনা, মিশরীয় সহ পৃথিবীর সকল অঞ্চলের প্রাচীন জ্ঞান সংরক্ষণ, অনুবাদ এবং শিক্ষা দেওয়া হতো। তৎকালীন মুসলিম পন্ডিতদের হাড়ভাঙা খাটুনির ফলেই পৃথিবীর সকল সভ্যতার জ্ঞানকে একত্রিত করা গেছে। মানবজাতির জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এর সাথে আর কোনো কিছুর তুলনা চলে না। বিভিন্ন ভাষার পান্ডুলিপির অনুবাদ এবং মৌলিক গবেষণায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে যে বর্তমান যুগে আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও গবেষণার পেছনে এত টাকা খরচ করা হয় না। তখনকার পন্ডিতদের বেতন বর্তমানকালের শীর্ষ গবেষকদের চেয়েও অনেক বেশি ছিল। ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ তথা বিশ্বের সকল প্রান্তের জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গুণীজনেরা এখানে জ্ঞান চর্চার জন্য আসতো। কথিত আছে কেউ কোনো জ্ঞান এর বই নিয়ে আসলে তাকে সেই পান্ডুলিপির সমপরিমাণ ওজনের স্বর্ণ দেওয়া হতো। তৎকালীন খিলাফত রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই পন্ডিতরা বহু মৌলিক আবিষ্কারে সফলতা খুঁজে পান। ১২৫৮ সালে কুখ্যাত হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গল বাহিনী বাগদাদ শহর অবরোধের সময় বায়তুল হিকমা ধ্বংস হয়ে যায়।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মুসলিম গবেষকদের হাত ধরে। ৮০৫ সালে বাগদাদে পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালও তৈরি করেছিল মুসলিমরা। ২৪ ঘন্টা হাসপাতাল খোলা রাখা এবং দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ধারণা মুসলিমদের আবিষ্কার। সেসময়ে মিশরের কালাউন হাসপাতালে দৈনিক প্রায় ৪০০০ রোগী বিনামূল্যে চিকিৎসা গ্রহণ করতো। বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক আবুল কাসিম আল জাহরাউীকে শল্য চিকিৎসার জনক বলা হয়। ১০০০ সালের দিকে তিনি দেড় হাজার পৃষ্ঠার মেডিকেল সার্জারির উপর একটি সচিত্র বই প্রকাশ করেন। পরবর্তী ৫০০ বছর ইউরোপের মেডিকেল রেফারেন্স হিসেবে বইটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মেডিকেল অপারেশনের জন্য তিনি যেসব অস্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন তার বেশিরভাগই ডাক্তাররা আজও ব্যবহার করে। আল জাহরাউী সর্বপ্রথম সিজারিয়ান অপারেশন করেছিলেন।
ইসলামী স্বর্ণযুগের আরেক মনীষী আবু আলী হোসাইন ইবনে সিনা। ইবনে সিনা আধুনিক ওষুধের জনক। তিনি একাধারে ছিলেন চিকিৎসক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং দার্শনিক। ইবনে সিনা রচিত কানুন ফিত্তিব বইটি চিকিৎসা শাস্ত্রের বিশ্বকোষ হিসেবে পরিচিত। পাঁচ খন্ডের এই বই ১৯ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের প্রায় সকল মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র এবং ধর্মতত্ত্বেও ইবনে সিনার বেশ দখল ছিল। আর্যবীতে ইবনে সিনাকে শাইখুল রাইস বা জ্ঞানীকুলের শিরোমণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আরেক বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী হলেন আবু বকর মোহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল রাজি। তিনি প্রথম শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। আল রাজি একাধারে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পদার্থবিদ, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ। জাবির ইবনে হাইয়ান ৩০০০ এর বেশি নিবন্ধ রচনা করেছেন। ধাতু পরিশোধন, তরলীকরণ, বাষ্পীভবন, এসিড সংশোধন, পাতন, কেলাসিকরণ, রাসায়নিক সংখ্যায়ন পদ্ধতি সহ রসায়ন শাস্ত্রের বহু বিষয় তিনি আবিষ্কার করেন। তিনিই সর্বপ্রথম ইস্পাত আবিষ্কার করেছিলেন।
সত্যিকারের বৈ বৈশ্বিক সভ্যতা মুসলিমরাই তৈরি করেছিল। হজের সময় সারা বিশ্বের মুসলিমদের মিলনমেলা ঘটত, সেখানে তারা নিজস্ব চিন্তা ও আঞ্চলিক জ্ঞান আদান প্রদান করতেন। এছাড়া আরব বণিকরা পৃথিবীর সকল মহাদেশে ব্যবসার কাজে গিয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান সংগ্রহ করে আনতেন। ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে চীনাদের কাছ থেকে মুসলিমরা কাগজ তৈরির পদ্ধতি শিখে। এরপর মুসলিমদের হাত ধরে কাগজের আরো উন্নতি হতে থাকে। পরবর্তীতে মুসলিমরাই সর্বপ্রথম পুরোদস্তুর পেপার মিল বা কাগজ কল প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমানেও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হলো আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়। ৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজ শহরে একটি মসজিদ সহ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো লাইব্রেরীটিও এই বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে। ৯৭০ সালে ফাতেমীয় খিলাফতের আমলে মিশরে স্থাপিত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী স্বর্ণযুগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। মাদ্রাসা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ১৯৬২ সালে আল আজহার পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। আধুনিক যুগের পাবলিক লাইব্রেরির ধারণাও এসেছিল ইসলামী স্বর্ণযুগের গ্রন্থাগারগুলো থেকে।
দ্বাদশ শতকের আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী ইসমাইল আল জাজারী অটোমেশন এবং রোবটিক্স এর জনক। তিনি ক্র্যাঙ্ক শাফট আবিষ্কার করেছিলেন। ক্র্যাঙ্কের সাহায্যে ভারী কোনো বস্তুকেও অনায়াসে টেনে তোলা যায়। তার এই আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে বিস্ফোরণের মত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি এই আবিষ্কার না করলে বাইসাইকেল থেকে শুরু করে আধুনিক মোটর গাড়ির ইঞ্জিন পর্যন্ত কোন কিছুই তৈরি করা সম্ভব হতো না। গণিতবিদ মোহাম্মদ আল ফাজারী প্রাচীন মহাকাশ ঘড়ির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। একে মধ্যযুগের জিপিএস বললেও ভুল হবে না। এই যন্ত্রের সাহায্যে মহাকাশের তারারাজির অবস্থান নির্ণয়ে এবং দিক নির্ণয় করা যেত। নামাজের কিবলা নির্ধারণ করতে যন্ত্রটির বহুল ব্যবহার হয়েছে। ভূগোলবিদ ও মানচিত্র অঙ্কন বিশারদ মোহাম্মদ আল ইদ্রিস বিশ্ব মানচিত্রের জনক। তিনি তাবুলার রোজারিয়ানা নামে মধ্যযুগের সেরা মানচিত্রটি তৈরি করেছিলেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের সময় এবং ভাস্কো দা গামা ভারতের জলপথ আবিষ্কারের সময় এই মানচিত্রটি ব্যবহার করেছিল। দশম শতকে আহমেদ আল হাসান প্রাচীন উইন্ডমিল বা বায়ুকলের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। এই যন্ত্র বিভিন্ন ধরনের শস্যপেষার কাজে এবং উপর দিকে পানি টানার জন্য ব্যবহৃত হতো। দ্বাদশ শতকে ইউরোপিয়ানরা এখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েই আধুনিক উইন্ডমিল তৈরি করেছে।
মানুষের উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন প্রথম বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরিনাস। নবম শতকে স্পেনের কর্ডোভা শহরে তিনি কয়েক মিনিট উড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মাটিতে পড়ে গিয়ে তার কোমর ভেঙে ফেলেন। তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও তার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিখ্যাত ইতালিয়ান শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি হারাইবার জাহাজের নকশা এঁকেছিলেন।
ইসলামী স্বর্ণযুগের বহু মুসলিম মনীষী তাদের নিজেদের কর্মের দ্বারা বিশ্ববাসীকে ঋণী করে গেছেন। তেমনি আরো কিছু উল্লেখযোগ্য হলো সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন, ত্রিকোণমিতির জনক নাসির উদ্দিন তুসী, পদার্থবিদ, ভূ-গণিতবিদ এবং প্রথম নিতাত্ত্বিক আল বিরুনী, মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদের জনক ইবনে রুশদ, দার্শনিক আল ফারাবী, চিকিৎসক ও জীববিজ্ঞানী ইবনে আননাফিস, চিন্তাবিদ আল কিন্দি, শিক্ষাবিদ ইমাম গাজ্জালী, জ্ঞানতাত্ত্বিক ইবনে তুফায়েল, মহাকাশ বিজ্ঞানী আব্দুর রহমান আল সূফি, প্রকৌশলী তিন ভাই আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে মুসা, আবুল কাশেম আহমেদ ইবনে মুসা এবং আল হাসান ইবনে মুসা প্রমুখ। এই সমস্ত কিছু হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ইসলামী স্বর্ণযুগে মুসলিমদের আবিষ্কারের খুব সামান্য অংশই এই ভিডিওতে বর্ণনা করা গেছে। সকল মুসলিম পন্ডিত এবং তাদের গবেষণার বিষয়ের শুধু নাম বলতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এছাড়া মুসলিমদের নাম লাতিন ভাষায় রূপান্তরের মাধ্যমে তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে অপরিচিত করে ফেলা হয়েছে। আল খোয়ারিজমির নাম করা হয় অ্যালগরিদিমি, ইবনে সিনাকে বলা হয় আভিসিনা, আল হাইসামের নাম হয়ে যায় আল হ্যাজেন ইত্যাদি। আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীদেরকে আমরা যতটুকু সম্মান দেই ইসলামী স্বর্ণযুগের বিজ্ঞানীরা তার সামান্য পরিমাণ স্বীকৃতিও পায় না। অথচ মুসলিম মনীষীদের গবেষণা ব্যতীত আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার ভিত্তি গড়ে উঠতো না। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার এত এত মনীষী তাদের জ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন শুধুমাত্র একজন মানুষের কাছ থেকে। আর তিনি হলেন ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more