বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৭): ৯/১১ হামলা ও 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ': বৈশ্বিক নিরাপত্তার নতুন মেরুকরণ
Date: 2026-10-07
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৭, ২০২৬, ৫:১৪ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৭): ৯/১১ হামলা ও 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ': বৈশ্বিক নিরাপত্তার নতুন মেরুকরণ
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের আকাশজুড়ে প্রতিদিনের মতোই ছিল এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে স্বাভাবিক কর্মব্যস্ততা। কিন্তু সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে বিশ্বরাজনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার চাকা এক নিমিষে থমকে গেল। আল-কায়েদার ১৯ জন আত্মঘাতী সদস্যের দল বস্টন, ওয়াশিংটন ও নিউয়ার্ক থেকে উড্ডয়ন করা চারটি বাণিজ্যিক বিমান (বোয়িং ৭৬৭ ও ৭৫৭) আকাশেই ছিনতাই বা হাইজ্যাক করে নেয়। প্রথম বিমানটি—আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১—সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে সরাসরি আঘাত হানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে দ্বিতীয় বিমানটি (ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১৭৫) আছড়ে পড়ে সাউথ টাওয়ারে। পুরো বিশ্ব সরাসরি সম্প্রচারিত সংবাদের পর্দায় দেখতে পায় শত তলার জোড়া টাওয়ার থেকে আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোঁয়ার প্রকাণ্ড কুণ্ডলী।
তাণ্ডব সেখানেই থেমে থাকেনি। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে তৃতীয় বিমানটি (আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭৭) সরাসরি নিয়ে আঘাত করানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ওয়াশিংটনের 'পেন্টাগন' ভবনে। আর চতুর্থ বিমানটি (ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৯৩)—যার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ছিল হোয়াইট হাউজ বা ইউএস ক্যাপিটল—বিমানের যাত্রীদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভেনিয়ার একটি খোলা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। দুই ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে চুরমার হয়ে মাটির সাথে মিশে যায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি বিশালাকার টাওয়ার। মোট ২,৯৭৭ জন নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি কেবল মার্কিন ভূমিকে রক্তে রঞ্জিত করেনি, বরং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে ওয়াশিংটনের অপরাজিত থাকার অহংকারকে এক ধাক্কায় চুরমার করে দিয়েছিল।
বিংশ শতাব্দীর সীমানাভিত্তিক ভূ-রাজনীতি ওই একদিনের ঘটনায় এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়। বিশ্বরাজনীতিতে এতদিন যুদ্ধের মূল ভয় ছিল কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা তাদের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু ৯/১১ হামলা প্রমাণ করে দিল, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এখন আর কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়, বরং সীমান্তহীন ও অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীও (Non-state actors) যেকোনো দেশের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁর ক্যাবিনেট নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন রূপরেখা তৈরি করেন, যা ইতিহাসে 'বুশ ডকট্রিন' এবং 'ওয়ার অন টেরর' (সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ) নামে পরিচিতি পায়। বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট দুটি বিপরীত শিবিরে ভাগ করে বুশ মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ঘোষণা দেন—"হয় আপনারা আমাদের পক্ষে, না হয় আপনারা সন্ত্রাসীদের পক্ষে।" এই নীতিকে অস্ত্র বানিয়ে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রধান সামরিক মিত্র ন্যাটো শুরু করে 'অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম'। আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে তৎকালীন তালেবান সরকারকে উৎখাত করা হয় এবং আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন ও তার আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার সামরিক অভিযান শুরু হয়।
কিন্তু এই যুদ্ধের দাবানল আফগানিস্তানের পাহাড়ে থমকে থাকেনি। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র আপত্তি এবং জাতিসংঘের অনুমোদন তোয়াক্কা না করেই 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' (WMD - Weapons of Mass Destruction) মজুদের সম্পূর্ণ কাল্পনিক অভিযোগ তুলে ইরাক আক্রমণ করে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রবাহিনী। সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতন ঘটানো হলেও সেখানে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। উল্টো ইরাকের ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক কাঠামো ধসে পড়ার ফলে যে রাজনৈতিক শূন্যতার জন্ম হয়, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ইরাক ও সিরিয়ার চরম অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়েই পরবর্তীতে আত্মপ্রকাশ ঘটে আইএসআইএস (ISIS)-এর মতো আরও হিংস্র ও উগ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর।
দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা এই বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার ফ্রেমওয়ার্ককে পুরোপুরি বদলে দেয়। বিশ্বের প্রতিটি বেসামরিক বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল প্রবর্তন, গোপন তথ্য সংগ্রহের নামে সাধারণ মানুষের সার্বক্ষণিক ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসে ওয়াচডগ বা 'ম্যাস সার্ভেইল্যান্স' (Mass Surveillance) জোরদার করা, এবং ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌম দেশের সীমান্ত লঙ্ঘন করে টার্গেটেড কিলিং—আজকের বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই সবকিছুই ৯/১১ পরবর্তী পরিস্থিতির সরাসরি ফল।
ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক ব্যয়, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় কোটি কোটি মানুষের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হওয়ার ট্র্যাজেডি এবং লাখ লাখ বেসামরিক প্রাণের বিনিময়ে চালানো এই যুদ্ধের এক নাটকীয় সমাপ্তি ঘটে ২০২১ সালের আগস্টে। দুই দশক পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সাথে সাথেই কাবুল পুনরায় তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ৯/১১ পরবর্তী এই দুই দশকের ইতিহাস প্রমাণ করে যে—কেবল আধুনিক অস্ত্র আর সামরিক পরাক্রম দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দর্শন বা মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানকে উপড়ে ফেলা যায় না; বরং তা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
(আগামীকাল পর্ব ৮-এ থাকছে: চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও নতুন বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more