বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৪): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ
Date: 2026-10-04
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০৪, ২০২৬, ৫:৩১ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ৪): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ | বিশ্ব শাসনের ইতিহাস:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিধ্বংসী আগুনের ছাই ছাই হতে না হতেই, মাত্র দুই দশকের মাথায় মানবজাতিকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, রক্তক্ষয়ী ও মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডি—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ থেকে ১৯ ৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই সর্বগ্রাসী মহাযুদ্ধ কেবল ৭ থেকে ৮ কোটি মানুষের নির্মম প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা ইউরোপ-কেন্দ্রিক বিশ্ব শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত পতনঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন বিশ্বের রাজনীতি ও শক্তির ভারসাম্য দুটি চূড়ান্ত ও বিপরীতমুখী সামরিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একপক্ষে ছিল অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি জার্মানি, বেনিতো মুসোলিনির ইতালি ও ইম্পেরিয়াল জাপানের সমন্বয়ে গঠিত চরমপন্থী ‘অক্ষশক্তি’ (Axis Powers); অন্যদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘মিত্রশক্তি’ (Allied Powers)। এই যুদ্ধের শেষ পরিণতিতেই বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে সূচিত হয়েছিল এক নতুন যুগের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভিত্তি প্রোথিত ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ১৯১৯ সালের 'ভার্সাই চুক্তি'র অপমানজনক শর্তাবলীর ভেতরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানির ওপর যে বিশাল আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও সামরিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা জার্মান জাতির মনে গভীর ক্ষোভ ও চরম জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। এর সাথে ১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ অর্থনৈতিক মহামন্দা (Great Depression) যুক্ত হলে ইউরোপজুড়ে গণতন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। এই চরম বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত উত্থান ঘটে। হিটলার 'লেবেনস্রাউম' বা জার্মানদের জন্য বাড়তি ভূখণ্ড দখলের নীতির ঘোষণা দিয়ে ইউরোপের আন্তর্জাতিক সীমানা পুনর্বিন্যাসে মরিয়া হয়ে ওঠেন। অবশেষে ১৯৩৯ সালের ১ই সেপ্টেম্বর নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করলে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় তাণ্ডব শুরু হয়।
যুদ্ধের প্রাথমিক বছরগুলোতে হিটলারের 'ব্লিৎসক্রিগ' বা মবাইল বাজ্রবিদ্যুৎ আক্রমণের মুখে পতন ঘটে ফ্রান্সসহ পশ্চিম ইউরোপের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর। কিন্তু অক্ষশক্তির এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রাই তাদের চরম রাজনৈতিক ভুলের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৪১ সালের জুন মাসে হিটলার তাঁর ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তটি নেন—তিনি এককালীন পরম বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অনাগ্রাসন চুক্তি ভেঙে 'অপারেশন বারবারোসা'র মাধ্যমে মস্কো অভিমুখে বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেন। অন্যদিকে, ওই একই বছরের ডিসেম্বরে এশীয় পরাশক্তি জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌঘাঁটি 'পার্ল হারবার'-এ আকস্মিক বিমান হামলা চালায়। এই দুই ঘটনা বিশ্বযুদ্ধের পুরো মানচিত্র ও সামরিক গতিপথ রাতারাতি বদলে দেয়; নিরপেক্ষ ভূমিকা ত্যাগ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পূর্ণ শক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ১৯৪২-১৯৪৩ সালের 'স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধ'। মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠাণ্ডা ও বরফে ঢাকা স্টালিনগ্রাদে সোভিয়েত লাল ফৌজের (Red Army) অদম্য প্রতিরোধের মুখে হিটলারের অপ্রতিরোধ্য ষষ্ঠ আর্মি চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এটিই ছিল নাৎসি জার্মানির পতনের সূচনা। পরবর্তীতে ১৯৪৪ সালের ৬ই জুন মিত্রশক্তির ঐতিহাসিক 'ডি-ডে' (D-Day) অভিযানের মাধ্যমে ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে সফল অবতরণ ঘটে। পূর্বে সোভিয়েত বাহিনী এবং পশ্চিমে মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ অভিযানের সাঁড়াশি চাপে ১৯৪৫ সালের মে মাসে বার্লিনের পতন ঘটে এবং হিটলারের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে ইউরোপে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে এশীয় রণাঙ্গনে জাপানের অনমনীয় প্রতিরোধ ভাঙতে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ই আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে ফেলা হয় ইতিহাসের প্রথম পরমাণু বোমা 'লিটল বয়' ও 'ফ্যাট ম্যান'। কিছুক্ষণের মধ্যে দুটি তিলোত্তমা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং জাপানের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে এই মহাযুদ্ধের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্ব রাজনীতির পুরোনো সমীকরণগুলোকে চিরতরে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্ব শাসন করা ব্রিটেন ও ফ্রান্স অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে এতটাই পঙ্গু হয়ে পড়ে যে, তাদের পক্ষে আর বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। যুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতি বহু-মেরু কেন্দ্রিক শক্তির ভরকেন্দ্র হারিয়ে পরিষ্কার দুটি মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে (Bi-polar World)। যার একদিকে ছিল পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর অন্যদিকে ছিল সুবিশাল ভূখণ্ড ও সামরিক শক্তির অধিকারী সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই পরাশক্তির এই নতুন আদর্শিক ও সামরিক দ্বন্দ্বই পরবর্তীতে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল কয়েক দশকব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধ বা 'কোল্ড ওয়ার'-এর মুখোমুখি।
একই সাথে, বিশ্বশান্তি বজায় রাখা ও বৈশ্বিক সংঘাত এড়াতে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতিসংঘ’ (UN), এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি পুনর্গঠনে জন্ম নেয় ব্র্রেটন উডস প্রক্রিয়ার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোর দুর্বলতার সুযোগে ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকাজুড়ে শতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসনের বাঁধ ভাঙতে শুরু করে, সূচনা হয় বিশ্বজুড়ে নতুন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের নতুন এক ঐতিহাসিক সূর্যোদয়।
(আগামীকাল পর্ব ৫-এ থাকছে: স্নায়ুযুদ্ধ ও দ্বি-মেরু বিশ্ব: যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়াযুদ্ধ)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more