ইতিহাসের মহাপ্রতারক: যাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে বলিউড সিনেমা!
Date: 2026-07-10
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১০, ২০২৬, ৬:১৯ পি.এম
ইতিহাসের মহাপ্রতারক: যাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে বলিউড সিনেমা!
অ-অ+
বিশেষ প্রতিবেদন:
কেমন হয়, যদি কেউ গোটা তাজমহলই বিক্রি করে দিতে চায়? কিংবা ধরুন সংসদ ভবন? পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছে, তাই না? তাজমহল বা সংসদ ভবনের মালিক কি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, যে চাইলেই কেউ বিক্রি করে দেবে? নিশ্চয়ই না, এগুলো সরকারি সম্পত্তি। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন, ঠিক এমনটাই ঘটেছে ভারতে। গোটা তাজমহলই বেচে দিয়েছে এক ব্যক্তি, তাও একবার নয়, তিনবার। আর শুধু তাজমহলই নয়, সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতির ভবনসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা একাধিকবার বিক্রি করেছে এক লোক। নাম মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্ত, তবে সবাই তাকে চেনে 'মিস্টার নাটওয়ার লাল' নামে। হ্যাঁ, এই-ই আমাদের আজকের গল্পের নায়ক। অবশ্য এত বড় বড় জালিয়াতি যে করে বেড়িয়েছে, তাকে নায়ক বলাটা ঠিক শোভনীয় নয় হয়তো।
সে যাই হোক, কিন্তু আমাদের মিস্টার নাটওয়ার লাল কিন্তু আর দশটা বাটপার জালিয়াতির মতো ছিল না। রীতিমতো শিক্ষিত লোক সে, আইন বিষয়ে স্নাতক পাসও করেছিল। বিহারের সিওয়ান জেলায় তার জন্ম, তা বেশ আগের কথা। তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেট কোনো কিছুরই জন্ম হয়নি। একদিন নাটওয়ার লালের এক প্রতিবেশী তাকে কিছু নথিপত্র দিয়ে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কিছু টাকা তুলে এনে দেওয়ার অনুরোধ করেন। সে মোতাবেক নাটওয়ার লাল ব্যাংকে যায় এবং সেই প্রতিবেশীর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে আনে। টাকা তোলার সময় নাটওয়ার লাল খেয়াল করে, কোনো অ্যাকাউন্ট কার তা শনাক্তের একমাত্র উপায় হলো নথিতে থাকা স্বাক্ষর মেলে কিনা সেটা দেখা। স্বাক্ষর মিলে গেলেই টাকা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখানে একটা বিষয় আবারও মনে করিয়ে দিই, যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে তা বেশ আগের। এখনকার মতো পরিচয় শনাক্ত করার আধুনিক পদ্ধতি তখন ছিল না। তো যা বলছিলাম, পুরো ব্যাপারটা দেখে এক কুমনোভাব মাথায় আসলো নাটওয়ার লালের। সে চিন্তা করল, প্রতিবেশীর স্বাক্ষর যদি হুবহু নকল করা যায়, তাহলে তো কেল্লাফতে! যেমন ভাবা তেমন কাজ। স্বাক্ষর হুবহু নকল করে নিয়ে সে চলে গেল ব্যাংকে। ব্যাংক থেকে টাকাও তুলে আনলো কোনো ঝামেলা ছাড়াই। পরে অবশ্য সে ধরা পড়েছিল ঠিকই, তবে টাকার পরিমাণ খুব বেশি না হওয়ায় বেশি শাস্তি পেতে হয়নি তাকে। তবে এর মাধ্যমেই তার জালিয়াতি জগতে হাতেখড়ি।
নাটওয়ার লাল এরপর পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে যায়। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি এক বাচ্চাকে গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াত সে। তো একবার হুট করেই তার কিছু টাকার প্রয়োজন হলো। উপায় না দেখে ছাত্রের বাবার কাছে টাকা চায় সে, কিন্তু সে ভদ্রলোক তাকে টাকা দেননি এবং তাতে নাটওয়ার লাল বেশ রেগে যায়। সেই ছাত্রের বাবার ছিল তুলার ব্যবসা। নাটওয়ার লাল তার মনের ঝাল মেটাতে সেই ব্যবসার সাড়ে ৪ লাখ টাকা জালিয়াতি করে বাগিয়ে নিয়ে কলকাতা থেকে পালিয়ে আসে। তবে এসব বাটপাড়ি জালিয়াতি তো হরহামেশাই ঘটে।
তাজমহল বিক্রি করল কিভাবে এই লোক? তাও আবার একবার নয়, তিনবার! এ কাজের জন্য সে বড় বড় সরকারি কর্মকর্তার বেশ ধারণ করত। আর তার সাথে থাকত এমন সব নথিপত্র, যা দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় থাকত না যে এই লোক একটা প্রতারক আর কাগজপত্রগুলো ভুয়া। যেমন ধরুন, তাজমহল বিক্রির ধান্দা করলে তাজমহলের কয়টা দরজা আছে, কয়টা জানালা আছে, মোট জমির পরিমাণ কত, সেখানের বাগানে কী কী ফুল আছে—সবকিছুরই বিস্তারিত তথ্য তার কাছে থাকত। আর এসব কাগজে যেসব সরকারি স্বাক্ষরের প্রয়োজন হতো, তার সবটাই করত নাটওয়ার লাল নিজেই। সবটুকু স্বাক্ষর দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় থাকত না যে তা নকল। ভারতের সংসদ ভবনে সকল সংসদ সদস্যরা যখন অধিবেশনে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদের স্বাক্ষর নকল করে গোটা সংসদ ভবনই বেচে দেয়। এভাবে তিনবার তাজমহল, দুইবার লাল কেল্লা আর একবার রাষ্ট্রপতির ভবনও বিক্রি করে দেয় সে।
কথা হচ্ছে, কারা সেই মহান বুদ্ধিজীবী যারা নাটওয়ার লালের কাছ থেকে এসব স্থাপনা কিনত? মূলত নাটওয়ার লাল ভারতে ঘুরতে আসা বিদেশী পর্যটকদের লক্ষ্য বানাত, যাদের অঢেল টাকা আছে। সেই যুগে যোগাযোগের মাধ্যম ভালো না থাকায়, ইন্টারনেটের সুবিধা না থাকায় লোকজনের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে জালিয়াতি প্রকাশ পেতে বেশ সময় লাগত। ততক্ষণে বাবা নাটওয়ার লাল চম্পট! আর শুধু বিদেশী নয়, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বা বেসরকারি সংস্থার প্রধান সেজে ধীরুভাই আম্বানি কিংবা রতন টাটার মতো ভারতের নামজাদা ধনীকেও বোকা বানিয়েছিল এই লোক। এভাবে ভারতের আটটি প্রদেশে প্রতারণা ও জালিয়াতি চালায় নাটওয়ার লাল।
একবারের ঘটনা। রাজীব গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রী ছিলেন নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি। নাটওয়ার লাল দিল্লির এক নামজাদা ঘড়ির দোকানে গিয়ে নিজেকে অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয় দেয় আর বলে, "রাজীব গান্ধী কিছু বিদেশী মেহমানের সাথে একটি বৈঠক করবেন এবং বৈঠকের পর ভুরিভোজ হবে। তো সেই অনুষ্ঠানে যারা উপস্থিত থাকবেন, তাদের প্রত্যেককে গান্ধী সাহেব একটি করে ঘড়ি উপহার দিতে চান। মোট ৯৩টি ঘড়ির দরকার আর তা এই দোকান থেকেই নিতে বলা হয়েছে।" নাটওয়ার লাল পুরো ব্যাপারটা এমনভাবে দোকানের লোকদেরকে বলে যে তারা বিশ্বাস করে নেয় এবং ভুয়া চেকের বিনিময়ে তাকে ৯৩টি ঘড়ি দিয়ে দেয়। এভাবে নাটওয়ার লাল সুচতুরভাবে একের পর এক অপকর্ম করে যেতে থাকে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে মোট ১৫০টিরও বেশি মামলা দায়ের হয়। পুলিশ, প্রশাসন আর সাধারণ জনগণ—সবারই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে সে। অবশেষে এক সময় সে ধরা পড়ে। এতগুলো মামলার মধ্যে নয়টি মামলার নিষ্পত্তি হয় আর তাকে ১০৯ বছরের জেল দেওয়া হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সে জেলে ছিল মাত্র ২০ বছর। এর মধ্যে একাধিকবার সে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে জেল থেকে পালাতে সক্ষম হয়। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে দিল্লি policeকে ধোকা দিয়ে সেই যে পালালো সে, আর তার দেখাই পায়নি পুলিশ।
নাটওয়ার লাল যা যা করেছে তা অবশ্যই নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য কাজ—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে স্বীকার করতেই হবে যে তার মতো ধূর্ত লোক খুব কমই মেলে। মানুষকে বোকা বানানোর কাজে সিদ্ধহস্ত ছিল সে। একবার সে লখনউয়ের একটি কারাগারে বন্দি ছিল। তার স্ত্রী তাকে প্রায়ই অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্টের কথা লিখে চিঠি পাঠাত। কিন্তু সে চিঠির কোনো উত্তর দিত না। এক সময় তার পরিবারের অবস্থা এমন হয়েছিল যে জমিতে লাঙল দেওয়ার মতো পয়সাও ছিল না তাদের। কারাগারের জেলার সেই চিঠিগুলো পড়ে এবং নাটওয়ার লালকে চিঠির উত্তর দিতে বলে। জেলারের কথায় শেষমেষ নাটওয়ার লাল তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লেখে। জেলার ওই চিঠি পড়ে এবং দেখতে পায়, নাটওয়ার লাল তার স্ত্রীকে লিখেছে—তাদের জমির এক কোণায় কিছু সোনা পুঁতে রাখা আছে। মাটি খুঁড়ে সেই সোনা বের করে তা বিক্রি করে সংসার চালাতে বলেছে নাটওয়ার লাল। তো চিঠি পড়ে সেই খবর জানার পর জেলার সাহেব সেই সোনা হাতানোর লোভে পুলিশ বাহিনী নিয়ে পুরো জমি খুঁড়ে ফেলেন। কিন্তু বিধিবাম! কোনো কানাকড়িও পাওয়া যায় না। এরপর নাটওয়ার লাল তার স্ত্রীকে আরেকটি চিঠিতে লেখে, "এখন নিশ্চয়ই আমাদের জমিতে আর লাঙল দেওয়ার প্রয়োজন হবে না?" জেলে বসেও এভাবে পুরো পুলিশ প্রশাসনকে কায়দা করেছে এই লোক।
তবে গ্রামের লোকদের মধ্যে নাটওয়ার লালের বেশ সুখ্যাতি ছিল। যে গ্রামেই সে যেত, সেই গ্রামের লোকদের দাওয়াত করে পেট পুরে খাওয়াত সে। তার বিখ্যাত নাম 'মিস্টার নাটওয়ার লাল'—এর 'মিস্টার' অংশটুকু গ্রামের লোকদেরই দেওয়া। আগেই বলেছি ১৯৯৬ সাল থেকে সে নিখোঁজ। ২০০৯ সালে নাটওয়ার লালের পরিবার দাবি করে যে সে মারা গেছে। আদালতে তার নামে ঝুলে থাকা শতাধিক মামলা খারিজের আবেদন জানানো হয়। তবে তার পরিবারের এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারায়, সে আবেদন গ্রহণ করেনি আদালত। যে লোক তাজমহল পর্যন্ত বেচে দিতে পারে, তার মৃত্যুর খবরে বিশ্বাস কী বলুন? তার চমকপ্রদ জীবনকাহিনী নিয়ে বলিউডে নির্মিত হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র—যেমন অমিতাভ বচ্চনের 'মিস্টার নাটওয়ার লাল' কিংবা ইমরান হাশমির 'রাজা নাটওয়ার লাল'। আর কেনই বা হবে না বলুন? যে কীর্তি সে করেছে, তা তো চলচ্চিত্রের গল্পকেও হার মানায়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more