জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে জিয়া পরিবার: বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক বিরল অধ্যায়
Date: 2026-09-23
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ৩:০৫ এ.এম
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে জিয়া পরিবার: বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক বিরল অধ্যায়
অ-অ+
সম্পাদকীয়-
বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে কিছু ঘটনা কেবল রাজনৈতিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসে এমনই এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি হতে যাচ্ছে। একই পরিবারের তিন সদস্য পৃথক সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার গৌরব অর্জন করছেন—সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরবেন তিনি। তাঁর এই আসন্ন সফর ও ভাষণকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করার পর থেকেই বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং একটি ন্যায়সংগত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বশান্তির আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে তাঁর সেই ভাষণটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর तत्कालीन প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন। জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরবর্তীতে সরকারের প্রধান হিসেবে তাঁর মেয়াদে বহুপাক্ষিক কূটনীতি, সাম্য, নারী ও শিশু অধিকার এবং প্রগণতান্ত্রিক মূলবোধের কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা হয়।
তৃতীয় সদস্য হিসেবে তারেক রহমান ও কূটনৈতিক প্রত্যাশা সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
একই পরিবারের পিতা, মাতা ও পুত্র—তিনজনই নিজ নিজ সময়ে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সরকারের সূত্র অনুযায়ী, তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক রূপান্তর, বৈশ্বিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের প্রস্তাবগুলো প্রাধান্য পাবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অধিবেশনে বাংলাদেশের দ্বিগুণ তাৎপর্য এবারের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আরও একটি কারণে ঐতিহাসিক। ড. খলিলুর রহমান এই অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন (তিনি ২০২৬ সালের ২ জুন নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন)। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধি সভাপতিত্ব করছেন এবং একই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান বক্তব্য রাখছেন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালো হচ্ছে।
শেষ কথা ইতিহাসের পাতায় কোনো ঘটনার গুরুত্ব কেবল তার ব্যতিক্রমী রূপের জন্য নয়, বরং তা দেশের জন্য কী ধরনের দূরদর্শী বার্তা বহন করছে তার ওপর নির্ভর করে। জিয়া পরিবারের তিন সদস্যের পর্যায়ক্রমে জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করার এই ধারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভবিষ্যৎ ও রূপরেখা স্পষ্ট করার এক অনন্য সুযোগ। লেখক ও সাংবাদিক- মো. তরিকুল ইসলাম মোস্তফা।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more