প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ০৫, ২০২৬, ৭:০০ এ.এম
যেভাবে ঘটেছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
সরকার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কঠোর কারফিউ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় এবং আগের কয়েক দিনের প্রাণঘাতী পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচনা করে দেশের হাজারো ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো রাজধানী পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। দিনের শেষভাগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বার্তা পৌঁছাতেই এই আন্দোলন চূড়ান্ত বিজয়ের উল্লাসে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হয় এক নতুন পথচলা।
এর আগের দিন ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পূর্বঘোষিত ৬ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালনের নির্দেশ দেন। তিনি দেশবাসীকে দ্রুত ঢাকায় এসে ‘চূড়ান্ত লড়াইয়ে’ অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে বেলা ১১টায় শাহবাগে শ্রমিক সমাবেশ, বিকেল ৫টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নারী সমাবেশ এবং দেশজুড়ে গণ-অবস্থানের ডাক দেওয়া হয়। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। অপর সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট বার্তা দেন যে, নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার বা ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হলেও সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
৫ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও রামপুরায় বসানো হয় কাঁটাতারের ব্যারিকেড। মাইকিং করে বাসিন্দাদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং কারফিউ পাসধারীদেরও পড়তে হয় কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে। সকাল ১০টা পর্যন্ত শহরের মূল পথগুলো প্রায় নির্জন থাকলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
সকাল গড়ালেই প্রথমে খুদে শিক্ষার্থীরা এবং পরে শিক্ষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী ও প্রবীণসহ নানা পেশার মানুষ রাজপথে নামতে শুরু করেন। বেলা ১১টায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হলেও জনতার অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের ছোট ছোট মিছিল গিয়ে মিশতে থাকে মূল প্রবাহে।
শাহবাগ ও চানখাঁরপুল এলাকায় ওইদিন সকাল থেকেই কড়া পাহারা ছিল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতালের পেছনের গলি থেকে শত শত মানুষ হ্যান্ডমাইকে স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে আসেন। সাড়ে ১১টার পর চানখাঁরপুল দিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে এলেও আন্দোলনকারীরা পিছপা হননি। দুপুর ১২টার পর মৎস্য ভবনের দিক থেকে আসা প্রায় ৫০০ মানুষের এক মিছিলে অগ্রভাগে ছিলেন প্রায় ৫০ জন নারী। মিছিলটি শাহবাগের দিকে অগ্রসর হলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্রিজের কাছে তাদের আটকানোর চেষ্টা করেন। সে সময় আন্দোলনকারীরা সেনা সদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন। এরপর ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগে অবস্থান নিলে পুরো এলাকা এক দফার গর্জনে মুখরিত হয়ে ওঠে।
বিকেলের দিকে সেনাবাহিনী প্রধানের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের খবর ছড়ায়। এর পরপরই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রচারিত হলে স্তব্ধ রাজপথ মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে। শাহবাগ থেকে শুরু করে টিএসসি, বাংলামোটর, কাকরাইল ও গণভবন এলাকা জয়ে উন্মুখ জনতার মিছিলে পূর্ণ হয়ে যায়। কেউ আনন্দে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন, কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, আবার অনেককে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের সাথে করমর্দন ও কোলাকুলি করতে দেখা যায়।
কারফিউ, গুলিবর্ষণ ও ডিজিটাল যোগাযোগের ব্ল্যাকআউট উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসা এই সাধারণ মানুষের স্রোত ৫ আগস্টকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more