প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২৮, ২০২৬, ১২:০৬ পি.এম
"মুক্তিযুদ্ধের চেতনা" আসলে কী?
অ-অ+
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা -
পটভূমি ও শোষণের ইতিহাস: ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের শাসন থেকে বাঁচতে এই অঞ্চলের মানুষ মুসলিম লীগকে সমর্থন করেছিল। মুসলিম লীগের হাত ধরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীনে আমরা নিরাপত্তা খুঁজেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে সেই রাষ্ট্রই আমাদেরকে শাসনের নামে শোষণ করতে শুরু করে।
উপমহাদেশ স্বাধীন হইবার পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিরা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সর্বক্ষেত্রে শোষণ আর বঞ্চনার শিকার হচ্ছিল। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস। সেই বঞ্চনা থেকে বাঁচতেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল।
মুক্তির আকাঙ্ক্ষা: ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা শুধুমাত্র একটি সার্বভৌম ভূখণ্ড বা মানচিত্রের জন্য হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ শুধু একটি রাষ্ট্র চায়নি। এদেশের মানুষ চেয়েছে মুক্তি। শাসকের শোষণ থেকে মুক্তি, মানবাধিকারের banchana থেকে মুক্তি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক মুক্তি। সে কারণেই আমাদের সেই যুদ্ধকে ভালোবেসে নাম দেওয়া হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তির পেছনে থাকা কিছু আদর্শ, মূল্যবোধ আর বুকভরা স্বপ্নের মিশেলে তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তি, বাঙালিত্ব, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবাধিকারের মতো আদর্শগুলো ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিমূর্ত প্রতীক আমাদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।
জাতীয়তাবাদের বিকাশ:
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বাঙালির বঞ্চনাবোধের প্রকাশ ঘটে। ৬০-এর দশকে সেই বঞ্চনার কারণেই প্রথমদিকে স্বাধিকারের দাবি ওঠে এবং পরবর্তীতে মুহুর্মুহু আন্দোলন শুধু স্বাধীনতা নয়, বরং প্রকৃত মুক্তি সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। এই মুক্তি মানে মানুষের সার্বিক বিকাশের মুক্তি। ভারত ভাগ হওয়ার আগে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে বাঙালি সত্তার আবেগ ততটা ছিল না, যতটা তারা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হবার পর বোধ করেছে। পাকিস্তানের সাথে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে জাতিগতভাবে বাঙালি পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে ওঠে। ৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ৬০-এর দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতিগতভাবে বাঙালিত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ: আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম একটি শক্তিশালী দিক ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়ার জন্য নানা ধাপে বহু ত্যাগ স্বীকার করেছে। সর্বশেষ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করার পরও আওয়ামী লীগকে সরকার পরিচালনা করতে না দিয়ে, বাংলার মানুষকে গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। প্রকৃত অর্থে সেই গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই মুক্তিযুদ্ধে লাখো বাঙালি জীবন বিসর্জন দিয়েছে।
অসাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্য বিলোপ: উপমহাদেশ ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। পাকিস্তানিরা ধর্মের মতো পবিত্র বিষয়কে তাদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাঙালিরা ধর্মকে যথাযথ সম্মান দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো হিসেবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ভিন্নধর্মী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে থাকে। আমাদের অঞ্চল সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করলেও, এখানকার জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে তার সামান্যই ব্যয় করা হতো। সব মিলিয়ে দুই পাকিস্তানের সিংহভাগ সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু পরিবার এবং গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফা দাবিতে বৈষম্য ঘোচানোর মতো বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। সেই থেকে বৈষম্য বিলোপ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অন্যতম উপাদানে পরিণত হয়।
মানবাধিকারের লড়াই: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় পর্যন্ত পুরোটা সময় জুড়েই মূলত মানবাধিকার অর্জনের লড়াই চলেছে। রাজনৈতিক অধিকার আদায়, নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার, ধর্ম পালনের অধিকার, মত প্রকাশের অধিকারসহ সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য. কিন্তু পাকিস্তানিরা বরাবরই এই অঞ্চলে মানবাধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। সেই হিংস্র অপচেষ্টার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯৭১ সালে ৯ মাস জুড়ে চালানো নির্বাচিত গণহত্যার মাধ্যমে।
মন্তব্য: মহৎ মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হিসেবে যে আদর্শ আর মূল্যবোধ কাজ করেছিল, সেই আদর্শগুলোই মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমরা যে বিষয়গুলোর প্রতিবাদ করেছি, যেমন বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছি, তার জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পার করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনেক মৌলিক বিষয় এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে সার্বিক মুক্তি, দেশ পরিচালনায় প্রকৃত গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয়ভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং নাগরিক জীবনে মানবাধিকার নিশ্চিত করাই হলো মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। - মেহেদী হাসান
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more