প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ৩০, ২০২৬, ৪:৫৪ এ.এম
প্রতারণার ফাঁদে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং যেকোনো মূল্যে দেশ ছাড়ার তীব্র প্রবণতাকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এর ফলে একদিকে যেমন অভিবাসনের নামে মানব পাচার বাড়ছে, অন্যদিকে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পেয়ে চরম নির্যাতন ও জিম্মি দশার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য তরুণ।
আজ ৩০ জুলাই পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস’। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো—**‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দী’**। **ইউরোপযাত্রা ও ভূমধ্যসাগরের ঝুঁকি**
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ইতালি যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া নাগরিকদের মধ্যে গতবারের মতো এবারও বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছে। পাশাপাশি গ্রিস যাওয়ার সমুদ্রপথের তালিকায়ও প্রথমবারের মতো শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশিরা। ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই লিবিয়া হয়ে ইতালিতে প্রবেশ করেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, লিবিয়ার বিভিন্ন বন্দিক্যাম্পে আটকে রেখে অভিবাসীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছ থেকে জিম্মি করে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এ বছরের মার্চেই লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ট্রলারডুবিতে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারগুলোর পাশাপাশি নতুন গন্তব্যের নামেও চলছে প্রতারণা। ওমান ও মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ থাকায় এবং আরব আমিরাতের পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সৌদি আরব ছাড়া বড় কোনো শ্রমবাজারের সুযোগ নেই বললেই চলে। এই সুযোগে রাশিয়াকে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে ব্যবহার করছে একটি চক্র। গত বছর রাশিয়া যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও, তাঁদের একটি অংশকে সরাসরি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণহীনভাবে অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়ায় অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দেশে ফিরছেন বা সেখানে প্রাণ হারাচ্ছেন।
অন্যদিকে, কম্বোডিয়ায় কল সেন্টারে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে অনলাইনে প্রতারণার কাজে বাধ্য করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সেদেশের প্রশাসন স্ক্যাম সেন্টারগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় সম্প্রতি ৫৮৩ জন কর্মী দেশে ফিরে এলেও, গত দেড় বছরে ১৫ হাজারের বেশি কর্মীকে কম্বোডিয়া যাওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। ব্র্যাকের এক জরিপ বলছে, কম্বোডিয়া থেকে ফেরা ৯৮ শতাংশ কর্মীই সেখানে কোনো চাকরি পাননি, বরং ৯০ শতাংশ মানুষকে জোর করে প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দায়েরকৃত মামলার প্রায় ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ আসামীই খালাস পেয়ে গেছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালেই নতুন করে ১ হাজার ১২৬টি মামলা হয়েছে এবং চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টির তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। অপরাধের তুলনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই মানব পাচারের প্রবণতা কমছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিবাসন খাতের অনিয়ম রোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনিয়মে জড়িত ৪৯টি এজেন্সি এবং রাশিয়ায় পাঠানো ৩টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। কম্বোডিয়ায় ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএমইটিকে সতর্ক করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দেশের অভ্যন্তরে নয়, ইউরোপ বা অন্যান্য গন্তব্য দেশগুলোর কঠোর নজরদারি এবং সামগ্রিক সচেতনতা ছাড়া এই মানব পাচার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more