স্নায়ুযুদ্ধের ‘বীর’ থেকে বৈশ্বিক ‘দানব’: উসামা বিন লাদেনের উত্থান, পতন ও আল-কায়েদার আদ্যোপান্ত
Date: 2026-08-09
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ০৯, ২০২৬, ১:১৬ পি.এম
স্নায়ুযুদ্ধের ‘বীর’ থেকে বৈশ্বিক ‘দানব’: উসামা বিন লাদেনের উত্থান, পতন ও আল-কায়েদার আদ্যোপান্ত
অ-অ+
বিডিফেসের বিশেষ আয়োজন:
(এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে)
একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির ইতিহাসে উসামা বিন লাদেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এক চরম বিপরীতমুখী রূপক। যে সৌদি ধনকুবেরকে একসময় মস্কোর সোভিয়েত শাসন রুখতে ওয়াশিংটন ‘স্বাধীনতার সংগ্রামী’ বানিয়ে অর্থ ও অস্ত্রের সাগরে ভাসিয়েছিল, কয়েক দশক পর সেই একই মানুষ রূপ নেন মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শত্রুতে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির উত্থান-পতনের ঘটনা নয়; এটি আমেরিকার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ভুল এবং একটি উগ্রপন্থী শক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার এক পূর্ণাঙ্গ দলিল।
১. সোভিয়েত আক্রমণ এবং সিআইএ-র ‘অপারেশন সাইক্লোন’ ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) আফগানিস্তান দখল করলে স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণ বদলে যায়। ওয়াশিংটন আশঙ্কা করে যে আফগানিস্তান হাতছাড়া হলে মস্কোর প্রভাব তেলসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সোভিয়েত সেনাকে আফগানিস্তানে ব্যস্ত রেখে ধসিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও পরবর্তীতে রোনাল্ড রেগানের নির্দেশে সিআইএ গ্রহণ করে ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ গোপন অভিযান—‘অপারেশন সাইক্লোন’। এই برنامের (পরিকল্পনার) অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলার ও অস্ত্র পৌঁছাতে থাকে আফগান প্রতিরোধ যোদ্ধা বা ‘মুজাহিদিন’দের কাছে। তবে যুদ্ধটিকে শুধু স্থানীয় আফগানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, আন্তর্জাতিক রূপ দিতে সমগ্র আরব বিশ্ব থেকে তরুণদের সংগঠিত করার কৌশল নেওয়া হয়।
২. লাদেনকে যেভাবে ব্যবহার করল আমেরিকা ঠিক এই সময়েই সিআইএ, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসেন তরুণ সৌদি ধনকুবের উসামা বিন লাদেন। কোটিপতি বাবার পারিবারিক সম্পদ ও প্রভাব নিয়ে লাদেন ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে আফগানিস্তানে পৌঁছান। তিনি গঠন করেন ‘মাকতাব আল-খিদমাত’ নামের এক কেন্দ্র, যার কাজ ছিল বিশ্বজুড়ে আরব তরুণদের (যাদের বলা হতো আরব-আফগান) রিক্রুট করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সীমান্তে পাঠানো। সিআইএ সরাসরি লাদেনের হাতে নগদ টাকা না তুলে দিলেও, তার সরবরাহকৃত আরব যোদ্ধাদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা বণ্টন করত। সিআইএ-র জোগান দেওয়া বিলিয়ন ডলারের সহায়তা এবং ১৯৮৬ সাল থেকে সরবরাহ করা সর্বাধুনিক বিমান বিধ্বংসী ‘স্ট্রিঙ্গার মিসাইল’ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী পরাজয় মেনে আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য হয়। সে সময় মার্কিন রাজনৈতিক মহল ও গণমাধ্যমে লাদেন এবং তার সহযোদ্ধাদের বর্ণনা করা হতো ‘সাম্যবাদ ধ্বংসকারী বীর’ বা ‘ফ্রিডম ফাইটার’ হিসেবে।
৩. ওয়াশিংটনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং ‘আল-কায়েদা’র জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তার উদ্দেশ্য হাসিল শেষে রাতারাতি সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু পেছনে ফেলে যায় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হাজার হাজার উগ্রপন্থী যোদ্ধা এবং গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্র। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে উসামা বিন লাদেন, মিসরীয় চিকিৎসক আয়মান আল-জওয়াহিরি ও অন্য সহযোগীরা অনুধাবন করেন যে তাদের অধীনস্ত প্রশিক্ষিত আরব যোদ্ধাদের এই শক্তিশালী অবকাঠামোকে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। সিআইএ এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর শেখানো সামরিক ও সাংগঠনিক পদ্ধতি এবং তথ্যের ডেটাবেস ব্যবহার করেই তারা গঠন করেন নতুন সংগঠন ‘আল-কায়েদা’ (যার আরবি অর্থ ‘ভিত্তি’ বা ‘ডেটাবেস’)।
৪. মোহভঙ্গ ও ‘ব্লোব্যাক’: হিরো কীভাবে ভিলেন হলেন? রাজনীতিতে একটি প্রচলিত শব্দ রয়েছে—‘ব্লোব্যাক’ (Blowback), যার অর্থ নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে লালন করা কোনো ছায়া-শক্তি পরবর্তীতে মূল পৃষ্ঠপোষকের দিকেই ঘুরে দাঁড়ানো। লাদেনের ক্ষেত্রে এই রূপান্তর ঘটে ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়। সাদ্দাম হোসেনের ইরাক কুয়েত দখল করলে বিন লাদেন সৌদি রাজপরিবারকে প্রস্তাব দেন তার আফগান ফেরত 'আরব-আফগান' বাহিনী দিয়ে সৌদি সীমান্ত রক্ষা করার। কিন্তু সৌদি সরকার লাদেনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইসলামের পবিত্র ভূমিতে (সৌদি আরব) হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে সামরিক ঘাঁটি গড়ার অনুমতি দেয়। পবিত্র ভূমিতে মার্কিন সেনার এই আগমনকে লাদেন ইসলামের ওপর আঘাত এবং আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করেন। যে আমেরিকান অস্ত্র ও নেটওয়ার্কের সাহায্যে তিনি সোভিয়েতদের হারিয়েছিলেন, সেই অবকাঠামো ব্যবহার করেই এবার তিনি আমেরিকার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের ঘোষণা দেন।
৫. হামলা, ৯/১১ এবং ভিলেনের চূড়ান্ত সিলমোহর ১৯৯০-এর দশকজুড়ে আল-কায়েদা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে সরাসরি মার্কিন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করে। ১৯৯৮ সালে তানজানিয়া ও কেনিয়ার মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস কোল'-এ হামলা চালিয়ে তারা নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। এর চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১)। চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে আল-কায়েদার চালানো হামলায় প্রায় ৩ হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। রাতারাতি আমেরিকার সাবেক মিত্র উসামা বিন লাদেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘ভিলেন’ ও ওয়ান্টেড ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেন "ওয়ার অন টেরর" (সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ)।
৬. ‘অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার’: বিন লাদেন যেভাবে ধ্বংস হলেন ৯/১১-এর হামলার পর আমেরিকান বাহিনী আফগানিস্তানে হামলা চালালেও তোরা বোরা পাহাড়ের পথ ধরে কৌশলে পালিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন বিন লাদেন। দীর্ঘদিন ধরে সিআইএ কোনো গোপন সূত্র বা ফোন নেটওয়ার্কের সরাসরি যোগাযোগ পাচ্ছিল না। অবশেষে বহু বছরের গোয়েন্দা চেষ্টার পর, সিআইএ বিন লাদেনের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত কুরিয়ার বা বার্তা বাহককে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ২০১০ সালে ওই কুরিয়ারকে অনুসরণ করে তারা পৌঁছে যায় পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে অবস্থিত একটি বিশাল নিরাপত্তা পরিবেষ্টিত কম্পাউন্ডে, যার নাম ছিল ‘ওয়াজিরিস্তান হাভেলি’। ২০১১ সালের ২ মে গভীর রাতে জালালাবাদ থেকে দুটি বিশেষ প্রযুক্তির স্টেলথ ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে করে মার্কিন নেভি সিল (SEAL Team Six) পরিচালিত গোপন অভিযান ‘অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার’-এর মাধ্যমে মাত্র ৪০ মিনিটের নিখুঁত অভিযানে কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে বিন লাদেনকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে পূর্ণ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিতের পর আন্তর্জাতিক সংঘাত ও পরবর্তী কোনো মাজার তৈরি হওয়া ঠেকাত তার মৃতদেহ আরব সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more