শ্রমিকদের অনিরাপদ জীবন ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

Date: 2026-05-01
news-banner

অনলাইন ডেস্ক:
বাগেরহাট জেলার দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মো. মোসলেম জীবিকার সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন বহু বছর আগে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার স্বপ্ন ছিল—কষ্ট করে হলেও স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটানো। সেই আশায় তিনি কাজ নেন ফেনীর একটি নির্মাণ প্রকল্পে।
কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি নির্মম ছিল। কাজ করার সময় একটি কংক্রিট মিক্সার মেশিন হঠাৎ উল্টে পড়ে তার ওপর। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। মুহূর্তেই থেমে যায় একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।
মোসলেমের মৃত্যুর পর ঠিকাদার পক্ষ থেকে তার পরিবারকে দেওয়া হয় মাত্র ২০ হাজার টাকা, যা কেবল মরদেহ পরিবহন ও দাফনের খরচেই শেষ হয়ে যায়। এরপর আর কোনো ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পায়নি পরিবারটি। বর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
এমন ঘটনা শুধু মোসলেমের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বরিশালের সাব্বির, যিনি রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করতেন, তিনিও একই বাস্তবতার শিকার। কর্মরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকলেও মালিকপক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পাননি তিনি।
বরং চিকিৎসার সময় আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার পরিবার আরও বিপদে পড়ে। তাদের কর্মব্যবস্থার নিয়ম ছিল স্পষ্ট—কাজ না করলে কোনো বেতন নেই। লিখিত চুক্তি বা নিয়োগপত্র না থাকায় আইনি অধিকার থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো দাবি তুলতে পারেননি। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারটি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ে।
মোসলেম ও সাব্বিরের এই দুই গল্প আসলে দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের লাখো শ্রমিকের বাস্তব চিত্র। নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি কিংবা গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত অধিকাংশ শ্রমিকই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন, কিন্তু তাদের নেই কোনো স্থায়ী সুরক্ষা বা নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এদের বড় অংশেরই নেই লিখিত চুক্তি, নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো বা সামাজিক নিরাপত্তা। ফলে দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার মতো পরিস্থিতিতে তারা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান শ্রম অধিকার কাঠামো মূলত প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এর বাইরে রয়ে গেছে।
শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, দেশের সব ধরনের শ্রমিকের জন্য একটি সর্বজনীন সুরক্ষা কাঠামো জরুরি। এতে থাকতে হবে ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ, শ্রমিকদের নিবন্ধন, সহজ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে এই শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। অথচ তাদের জীবন এখনো অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে আবদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।
 
তথ্য-জাগোবিডি


বিডিফেস/ মো. অহিদুজ্জামান ডিউক

Leave Your Comments