প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ১২, ২০২৬, ৫:০১ এ.এম
ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে বাউফলের সেই রক্তাক্ত তোরণ
অ-অ+
বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা সদরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জরাজীর্ণ তোরণ প্রতিদিনই পথচারীদের চোখে পড়ে। সময়ের সঙ্গে এর রং মুছে গেছে, কাঠামো হয়েছে জীর্ণ। কিন্তু এই তোরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় রাজনীতির এক রক্তাক্ত অধ্যায়, যা এখনো ভুলতে পারেননি অনেকেই। ছয় বছর আগে এই তোরণ নির্মাণকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নেয় একটি প্রাণ। এরপর রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, কিন্তু তোরণটি রয়ে গেছে একই অবস্থায়—অযত্নে, অবহেলায়।
২০২০ সালের ২৪ মে, ঈদুল ফিতরের আগের দিন তোরণ নির্মাণকে কেন্দ্র করে তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজের অনুসারী এবং বাউফল পৌরসভার তৎকালীন মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউল হক জুয়েলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সহিংসতায় গুরুতর আহত হন যুবলীগ নেতা তাপস কুমার দাস। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর নিহতের ভাই পঙ্কজ কুমার দাস বাউফল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় জিয়াউল হক জুয়েলকে প্রধান আসামি করে ৩৫-৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেই ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাত পুরোপুরি মুছে যায়নি।
বর্তমানে এলাকাটিতে বিএনপির বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা দেখা গেলেও তোরণটি সংস্কার কিংবা অপসারণের উদ্যোগ চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের একাংশের মতে, এটি এখন শুধু একটি জরাজীর্ণ স্থাপনা নয়; বরং বাউফলের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ প্রায় পাঁচ বছর অতিক্রম করলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হয়নি। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও সীমিত। উপজেলা ছাত্রদলের কমিটি থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি দলটির ভেতরে একাধিক নেতৃত্বকেন্দ্রিক বলয় সক্রিয় থাকায় রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাউফল পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির বলেন, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়ে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। তাঁর মতে, বিতর্কিত ইতিহাস বহনকারী এই জরাজীর্ণ তোরণ অপসারণ করাই উচিত।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান বলেন, অতীতের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রভাব দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর ভাষায়, উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন একটি ভগ্নপ্রায় তোরণ জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে। তাই এটি সংস্কার অথবা অপসারণ—যেকোনো একটি সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন।
আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক সামুয়েল আহমেদ লেনিন বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠন এবং গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার প্রক্রিয়া প্রয়োজন। এতে সাংগঠনিক গতিশীলতা ফিরবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একসময় যে তোরণকে ঘিরে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, আজ সেটিই নীরবে সময়ের সাক্ষ্য বহন করছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও জরাজীর্ণ এই স্থাপনাটি যেন মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতিতে ব্যক্তি ও ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সহিংসতার স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, অতীতের বিভেদ নয়, বরং উন্নয়ন, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিই বাউফলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more