সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস, কমান্ড কাঠামোর বিপর্যয় এবং মারাত্মক গোয়েন্দা ফাটলের মতো চরম প্রতিকূলতার মুখেও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ আবার নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের তীব্র ইসরায়েলি হামলার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা চিরতরে খর্ব হয়েছে। তবে সামনাসামনি যোগাযোগ এবং প্রথাগত প্রযুক্তিমুক্ত অভিনব কৌশল অবলম্বন করে ধ্বংসস্তূপ থেকেই নিজেদের পুনর্গঠন করছে সংগঠনটি। মিডল ইস্ট আই-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনের বরাতে হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, কৌশলগত পরিবর্তন এবং বর্তমান পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে।
মহাবিপর্যয় ও প্রযুক্তির ফাঁদ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে ইসরায়েলের একযোগে ৮০টি শক্তিশালী বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যায় পুরো কার্যালয়। এতে দীর্ঘদিনের সংগঠন প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হন। মাটির ৬০ ফুট গভীরে অবস্থান করেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। এর আগেই ইসরায়েলি গোয়েন্দারা হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসিয়ে হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরে নজিরবিহীন আঘাত হানে।
ইসরায়েলি আড়িপাতা ও ট্র্যাকিং এড়াতে হিজবুল্লাহর সারভাইভিং কমান্ডারেরা তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো ধরনের মুঠোফোন বা ইলেকট্রনিক যোগাযোগের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। বদলে তারা মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চলাচলের সিদ্ধান্ত নেন এবং রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় 'দাহিয়েহ' এলাকায় বেকারি, ব্যাংক ও ছোট দোকানে সামনাসামনি সাক্ষাতের মাধ্যমে শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ শুরু করেন।
মুখোমুখি যোগাযোগের নতুন যুগ ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধ্য হন কমান্ডাররা। কোনো প্রকার ডিজিটাল ট্রেইল না রেখে মুখোমুখি বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি— ১. দ্রুততম সময়ে নেতৃত্ব পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দূর করা। ২. দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল হামলা মোকাবিলার সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া। মার্কিন মধ্যস্থতায় অর্জিত যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতাকে রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহ নিজেদের পুনর্গঠনের কিছুটা সময় ও সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়।
২০২৩ সালের হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক প্রতিবেদনে বলা হয়, হিজবুল্লাহর ভেতরে সবাই কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। সংগঠনের একাধিক যোদ্ধা ও সূত্রের মতে, সেই সময় সরাসরি হাসান নাসরুল্লাহর নির্দেশেই হামলাটি পরিচালিত হয়, যা সংগঠনের ভেতরেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। এমনকি শুরা কাউন্সিলের ভেতরেও এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল। গাজায় হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে প্রচারিত তথ্যকে অবশ্য হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কেবল ইসরায়েলি 'প্রচারণা' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে অনেক সদস্যের মতে, 'ইউনিটি অব ফ্রন্টস' (সম্মিলিত প্রতিরোধ ফ্রন্ট) কৌশলের অংশ হিসেবেই সেই সময় হামলা ত্বরান্বিত হয়েছিল।
সোলাইমানি ও নাসরুল্লাহর 'ইউনিটি অব ফ্রন্টস' কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানি এবং হিজবুল্লাহর হাসান নাসরুল্লাহ যৌথভাবে ইসরায়েলকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলার যে 'ইউনিটি অব ফ্রন্টস' কৌশল তৈরি করেছিলেন, তার বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত জটিল। বর্তমানে দুজনই নিহত হওয়ায় এবং নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেবানন সরকার, শিয়া সম্প্রদায়ের একাংশের অসন্তোষ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়েই হিজবুল্লাহকে নতুন পথ নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
নতুন যুদ্ধকৌশল ও বর্তমান রূপরেখা চরম সামরিক ক্ষতি সত্ত্বেও হিজবুল্লাহর নতুন নেতৃত্ব ও মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা দেখিয়েছেন যে, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পরও সংগঠনের সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। প্রথাগত কমান্ড চেইন বদলে এখন তারা বিকেন্দ্রীকৃত (decentralized) স্থানীয় ইউনিটের ওপর জোর দিচ্ছে, যাতে কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় কমান্ডারেরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more