স্বাদ ও সুবাসে যা একসময় দেশজুড়ে সুখ্যাতি কুড়িয়েছিল, সেই টাঙ্গাইলের মধুপুরের বিখ্যাত আনারস এখন নিজস্ব সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য হারাতে বসেছে। ফল বড় করা, একসঙ্গে ফল ধরানো এবং দ্রুত পাকানোর জন্য অনিয়ন্ত্রিত হরমোন ও রাসায়নিকের ব্যবহারের কারণে এর ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ও ঘ্রাণ বিলুপ্ত হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখতে আকর্ষণীয় ও আকারে বড় হলেও আনারসের আসল স্বাদের অভাব থাকায় ক্রেতাদের আগ্রহ কমছে। এর প্রভাবে পাইকারি বাজারে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হচ্ছে মধুপুরের ঐতিহ্যবাহী এই ফল, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ চাষিদের।
বাজারে ধস, আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মধুপুরে চলতি মৌসুমে ৬ হাজার ৬৩৮ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেণ্ডার (জায়ান্ট কিউ) ৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টরে, জলডুগি ২ হাজার ২৪৫ হেক্টরে এবং এমডি-২ জাতের আনারস চাষ হয়েছে ১৮ হেক্টরে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। তবে জলছত্র ও গারোর বাজারের মতো প্রধান পাইকারি হাটগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। ফলন ভালো হওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। জলছত্র বাজারের কৃষক রনি মিয়া জানান, গত মৌসুমে যে আকারের আনারস পাইকারিতে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার একই আকারের ফল বিক্রি করতে হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়।
অকাল ফলন ও রাসায়নিকের ব্যবহার স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, আনারসের আকার বড় করার জন্য বাজারে প্যানোফিক্স, সুপারফিক্স, ক্রপকেয়ার ও অঙ্কুর-এর মতো উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। আর দ্রুত ও একসঙ্গে পাকানোর জন্য স্প্রে করা হচ্ছে রাইফেন, হারবেস্ট, প্রমোট, সারাগোল্ড, ক্রিটিপাস ও অ্যালপেনের মতো রাসায়নিক। স্বাভাবিক নিয়মে একটি আনারস গাছে কমপক্ষে ৬০টি পাতা গজানোর পর ফল ধরে। তবে অনিয়ন্ত্রিত হরমোন প্রয়োগ করে মাত্র ২৮টি পাতা থাকা অবস্থাতেই গাছে ফল আনা হচ্ছে, যাকে স্থানীয় ভাষায় চাষিরা ‘গর্ভবতী’ করা বলে থাকেন। এর ফলে স্বাভাবিক সময়ে ধাপে ধাপে বাজারে আনারস আসার বদলে, কৃত্রিম উপায়ে একসঙ্গে বিশাল পরিমাণ আনারস বাজারে চলে আসছে। এতে বাজারে সরবরাহ অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যাচ্ছে বলে জানান গারোর বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন।
বিপাকে বিষমুক্ত ও প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ করা কৃষকেরা অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে যারা আনারস চাষ করছেন, তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। হাগুড়াকুড়ি গ্রামের চাষি সোহেল রানা জানান, চার বিঘা জমিতে ২২ হাজার আনারস চাষ করলেও তিনি কোনো হরমোন বা রাসায়নিক ব্যবহার করেননি। ফলে তার উৎপাদন খরচ বেশি এবং বাজারে রাসায়নিকযুক্ত ফলের সাথে দামের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতারা বেশি দাম দিয়ে ছোট আকারের প্রাকৃতিক ফলের চেয়ে বড় আকারের কৃত্রিম ফল কিনতে প্রাধান্য দেওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক চাষি ক্ষতিকর রাসায়নিকের দিকে ঝুঁকছেন। ঐতিহ্য রক্ষা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের মেঘালয় থেকে চারা এনে মধুপুর গড় এলাকায় প্রথম আনারস চাষ শুরু হয়েছিল। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ও গারো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি অজয় এ মৃ জানান, গত দুই দশকে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা জমি ইজারা (লিজ) নিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থে অতিমাত্রায় হরমোন ব্যবহার করছেন। এর খেসারত দিতে হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী চাষিদের।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) টাঙ্গাইল শাখার সাধারণ সম্পাদক শহীদ মাহমুদ জানান, মধুপুরের আনারস এ অঞ্চলের বড় পরিচয় ও ঐতিহ্য। অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে এই সুনাম নষ্ট করা হচ্ছে, যা বন্ধে প্রশাসনের জোরদার পদক্ষেপ জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আজিজুল হক সতর্ক করে বলেন, “অণুজীবের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় কৃষিকাজে পরিমিত রাসায়নিক প্রয়োগ অপরাধ নয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ও যথেচ্ছ হরমোন ব্যবহার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ দাঁড়ায়। কৃষকদের অবশ্যই কৃষি বিভাগের নির্দেশনামা মেনে নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে।”
অন্যদিকে মধুপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মমতাজ মুনা জানান, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। চাষিদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কৃষি বিভাগ থেকে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more